• মাধুকর প্রতিনিধি
  • তারিখঃ ৪-১২-২০২২, সময়ঃ সকাল ১১:১৬
  • ৭৬ বার দেখা হয়েছে

আজ ফুলছড়ি হানাদার মুক্ত দিবস

আজ ফুলছড়ি হানাদার মুক্ত দিবস

গৌতম চন্দ্র মোদক ►

৪ ডিসেম্বর ৭১’র- এ দিনে উত্তর রণাঙ্গণের দ্বিতীয় থানা হিসেবে ফুলছড়ি থানা সম্পূর্ণরুপে পাকিস্তানী হানাদার মূক্ত হয়। উত্তর রণাঙ্গনের অন্যতম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা রোস্তম আলী খন্দকারের নেতৃত্বাধীন রোস্তম কোম্পানী মুক্তিযোদ্ধারা এদিনে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে কয়েকটি স্পটে সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হয়।

স্পটগুলো হলো- ফুলছড়ি থানা সদর, ঘাঘট রেল ও সড়ক সেতু ও চুড়ান্ত যুদ্ধ সংগঠিত হয় সাঘাটা থানার গোবিন্দী ওয়াপদা বাঁধে। দিন রাতের এ যুদ্ধে পাঁচ জন বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তারা হলেন- বগুড়ার গাবতলী থানার জাহিদুল ইসলাম বাদল, গাইবান্ধার সাঘাটা থানার আফজাল, আব্দস সোবহান, ওসমান গণী ও কাবেজ আলী। বিপরীতে পাকিস্তানী বাহিনীর ২৭ সেনা নিহত হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের পাঁচটি ৩০৩ রাইফেল খোঁয়া যায়। 

৪ ডিসেম্বর যুদ্ধে ফুলছড়ি থানা উত্তরবঙ্গের দ্বিতীয় থানা হিসেবে হানাদার মুক্ত হয়। ফুলছড়ি হানাদার মুক্ত হওয়ার খবরে মুক্তিযোদ্ধারা বেশি উৎসাহিত হয় এবং তাদের মনোবল যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। ৩ ডিসেম্বর সকালে গলনার চরের হাইডআউটে বিশ্বস্ত সূত্রে খবর আসে যে, ২ ডিসেম্বর ফুলছড়ি টি,টি,ডি,সি ক্যাম্প হতে কিছু সেনা প্রত্যাহার করে গাইবান্ধায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওই খবরের সঠিকতা নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটি ফাইটিং প্লাটুন ফুলছড়ি সদরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী ৪ ডিসেম্বর সকালে প্লাটুন কমান্ডার সামছুল আলমকে ফাইটিং প্লাটুন নিয়ে ফুলছড়ি পাঠানো হয়। এবং খবরের সত্যতা যাচাই শেষে সুযোগ বুঝে ফুলছড়ি থানা রেইড করার জন্য বলা হয়। সকাল ৮টায় সামছুল আলমকে ফুলছড়ি পাঠানো হয়। 

কোম্পানীর অন্য সকলে তাদের সফলতার আশা ও বিপদে পড়লে প্রস্ততি নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি। বেলা ১২টায়  সামছুল আলম সফলভাবে তথ্য যাচাই করে সুযোগ পেয়ে ফুলছড়ি থানার রেইড করে বিনা বাঁধায় থানার মালখানা হতে ২৫টি রাইফেল ও কয়েক বাক্স গুলি নিয়ে হাইডআউটে ফিরে আসে। 

দুপুর ২টায় সকল প্লাটুন কমান্ডারগণকে তাদের মুক্তিযোদ্ধাদেরকে যুদ্ধ সাজে নিয়ে সবেদ আলী মেম্বারের বাড়ীর উঠানে আসার জন্য বলা হয়। ২টার মধ্যে পুরো কোম্পানী সমবেত হয়। ৩ঘটিকায় আলম, মহসিন, নাজিম, এনামুল এর প্লাটুনকে টি,টি,ডি,সি, ক্যাম্প ও ফুলছড়ি  থানা এলাকায় অবস্থান নেয়। তসলিম ও রফিকের প্লাটুন ঘাঘট রেল ও সড়ক সেতুতে অবস্থান নেয়। ফুলছড়ি ক্যাম্পের সেনা কমান্ডার তার ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ করবে সেই সম্ভাবনায় তারা সুরক্ষিত থাকার জন্য অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর জন্য ওয়্যারলেসে খবর দেয়। 

ফুলছড়ি ক্যাম্প এর উপর মুক্তিযোদ্ধা আক্রমন করলে উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়,অবস্থা বেগতিক হলে শত্রুসেনারা সাঘাটার গোবিন্দী ওয়াপদা বাঁধের দিকে পালাতে শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের পিছু পিছু ধাওয়া করে যেতে থাকে। ইতিমধ্যে রেলপথে বোনারপাড়া হতে ও সড়কপথে ঘাঘট রেলসেতুর পশ্চিম প্রান্তে এসে উপস্থিত হয়।

তারাও ব্রীজ পাড় হয়ে গোবিন্দীর দিকে রওনা হয়। বাঁধের ওপর মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য এ্যাম্বুস পেতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। প্রথমে পাকিস্তানীর বাহিনীর বিরুদ্ধে এনামুলের প্লাটুনের সাথে যুদ্ধ হয়। একে একে সকল প্লাটুনের যোদ্ধারা যুদ্ধে জড়িয়ে পরে। 

সেখানে তুমুল যুদ্ধ হয়। দিন-রাতের এ যুদ্ধে রোস্তম কোম্পানীর ৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। পরদিন প্লাটুন কমান্ডার এনামুল হক ও বজলুসহ কয়েকজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ গরুর গাড়ীতে করে সাঘাটার তৎকালীন সগুনা ইউনিয়নের ধনারুহা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে পাঁচটি কবরে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় ধর্মীয় নীতি অনুসরণ করে তাদেরকে সমাহিত করা হয়।

দেশ স্বাধীন হলে রোস্তম আলী খন্দকার পি,ডব্লিউ,আই ও স্থানীয় জনগণের সহায়তায় কবর পাঁচটি পাঁকা ও পার্শ্বে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। সগুনা ইউনিয়নে ৫ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সমাধীর অবস্থান ও স্থানীয় জনগনের দাবীর স্বীকৃতি হিসেবে সরকার ১৯৮২ সালে গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সগুনা ইউনিয়নের নামকরণ করেন মুক্তিনগর ইউনিয়ন। যা একটি বিরল ঘটনা। প্রয়াত ডেপুটি স্পিকার এ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়ার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এল,জি,ই,ডির অর্থায়নে ধনারুহায় একটি দৃষ্টিনন্দন সৃতিস্তম্ভ ও পাঠাগার নির্মিত হয়।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, কোম্পানী উপ-অধিনায়ক (টু,আই,সি), রোস্তম কোম্পানী-১১ নম্বর সেক্টর। ও ডেপুটি ইউনিট কমান্ডার,গাইবান্ধা জেলা ইউনিট, কমান্ড বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। মোবাঃ ০১৭১৮-২২৯৬৭৮

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়