• মাধুকর প্রতিনিধি
  • তারিখঃ ২৯-১-২০২৪, সময়ঃ বিকাল ০৪:৪৬
  • ৪৭ বার দেখা হয়েছে

আদিবাসীদের মানবাধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র ব্যর্থ : সুলতানা কামাল

আদিবাসীদের মানবাধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র ব্যর্থ : সুলতানা কামাল

নিজস্ব প্রতিবেদক
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে তিন সাঁওতাল হত্যার বিচার দাবি করে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেছেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মানবাধিকার রক্ষা করা। আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, “আদিবাসীদের” মানবাধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে।

আজ সোমবার (২৯ জানুয়ারি) দুপুরে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটামোড় এলাকায় আয়োজিত সাঁওতাল সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

সুলতানা কামাল বলেন, “আদিবাসী” জনগোষ্ঠির ওপর নির্যাতন, হত্যা, ভূমি দখল চলতেই থাকবে? এটা তো হতে পারে না। তারা কি আন্দোলন করতে করতেই জীবন পার করবে? রাষ্ট্র যখন অন্যায় ও অপরাধের বিচার করে না, সেই কলঙ্ক কিন্তু জাতির গায়েও লাগে। আমরা এ দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে তা মেনে নিতে পারি না। আমরা এই কলঙ্ক বহন করতে রাজি নই। রাষ্ট্র যদি এখানে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন না করে, বিচার না করে, সেই কলঙ্কের দায়ভার রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। আমরা বারবার এই হত্যার বিচার দাবি করব।

সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ক্ষমতা পেতে এবং ক্ষমতায় টিকে থাকতে সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে বলে দাবি করলেও তারা সেই চেতনার বাইরে গিয়ে সাঁওতাল হত্যাকারীদের সঙ্গে আপসের নীতি অনুসরণ করছে। এই সাঁওতালরা দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় বাঙালিদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিড়ে পড়েছিল।

সুলতানা কামাল বলেন, আমরা উন্নয়ন চাই। যদি উন্নয়নের সুফল সব জনগোষ্ঠী সমানভাবে না পায়, যদি আদিবাসীদেরকে উচ্ছেদ হতে হয় তাহলে সেটি কিসের উন্নয়ন? দেশে প্রতিনিয়ত “আদিবাসীদের” মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। বিচারহীনতার কারণে এসব নির্যাতনের শিকার “আদিবাসীরা” কষ্ট পাচ্ছে।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে তিন সাঁওতাল হত্যার বিচার, আসামিদের গ্রেপ্তার, গুলিতে আহত সাঁওতাল, বাড়ি-ঘরে লুটপাট-অগ্নিসংযোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতালদের ক্ষতিপূরণ, সাঁওতালদের রক্তভেজা তিন ফসলি জমিতে ইপিজেড নির্মাণ বন্ধ ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য ভূমি কমিশন গঠনের দাবিতে যৌথভাবে এই সাঁওতাল সমাবেশের আয়োজন করে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, জনউদ্যোগ, আদিবাসী-বাঙালী সংহতি পরিষদ, গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদ, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি), বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ও কাপেং ফাউন্ডেশন।

সকালে গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালপল্লি মাদারপুর ও জয়পুর গ্রাম থেকে তির-ধনুক, ব্যানার, বিভিন্ন দাবিদাওয়া সংবলিত ফেস্টুন নিয়ে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি ১০ কিলোমিটার পথ প্রদক্ষিণ করে গোবিন্দগঞ্জ-দিনাজপুর সড়কের কাটামোড়ে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে বেলা ১১টায় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশের শুরুতে শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর প্রতিবাদী সংগীত পরিবেশিত হয়।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ডা. ফিলিমন বাস্কে। বক্তব্য দেন, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের উপদেষ্টা কাজল দেবনাথ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পরিষদের আহ্বায়ক এ্যাড. সিরাজুল ইসলাম বাবু, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রফিক আহম্মেদ সিরাজী, নাগরিক সংগঠন জনউদ্যোগের সদস্যসচিব প্রবীর চক্রবর্তী, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিচিত্রা তির্কী, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পষিদের সদর উপজেলা শাখার আহ্বায়ক গোলাম রব্বানী মুসা, গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর কবীর তনু, আদিবাসী নেতা সুফল হেমব্রম, প্রিসিলা মুর্মু, সন্ধ্যা মালো, গৌড়চন্দ্র পাহাড়ী প্রমুখ।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, যে কোন এলাকার উন্নয়নে ইপিজেড স্থাপন সেই এলাকার মানুষের জন্য অবশ্যই সুখের খবর। কিন্তু সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের আদিবাসী ও বাঙালিদের বাপ-দাদার জমিতে সেখানকার ওয়ারিশগণের সাথে কোন ধরনের স্বাধীন, পূর্বাবহিত সম্মতি ছাড়াই ইপিজেড স্থাপনের ঘোষণা আদিবাসী-বাঙালি জনগণকে হতাশ করেছে। বক্তারা বাগদাফার্মের তিন ফসলি জমিতে ইপিজেড স্থাপনের প্রক্রিয়া বন্ধ করে জেলার অন্যত্র করা, চাষাবাদরত সাঁওতাল-বাঙালিদের সেচ সুবিধার জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান, সমতলের আদিবাসীদের ভূমি সংকট নিরসনে পৃথক ও স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠনসহ সাত দফা বাস্তবায়নের দাবি করেন।

সভাপতি ফিলিমন বাস্কে বলেন, সুসংগঠিত সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের আন্দোলন সংগ্রাম ব্যাহত করতে কিছু মহল নানা ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পেতে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টির অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। কতিপয় স্বার্থান্বেষী মানুষ আদিবাসীদের ভয় ভীতি দেখিয়ে জমি দখল করছে এবং বহিরাগত প্রভাবশালী বাঙালিদের টাকার বিনিময়ে লিজ দিচ্ছে। এছাড়াও আন্দোলনে থাকা সদস্যদের সেচের যন্ত্রপাতি (ট্রান্সফরমার, মিটার, স্যালো মেশিন ও যন্ত্রাংশ) সংঘবদ্ধভাবে চুরি করছে যাতে সেচ কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত না হয়। ২০১৬ সালের হত্যাকান্ডের আসামিরা আবারও, হুমকি-ধামকি দিয়ে প্রকৃত সদস্যদের বিতাড়িত করার পায়তারা চালাচ্ছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের জমিতে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের দফায় দফায় সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে ৯ পুলিশ সদস্য তিরবিদ্ধ ও ৪ সাঁওতাল গুলিবিদ্ধ হন। তাঁদের মধ্যে তিন সাঁওতাল শ্যামল, মঙ্গল ও রমেশ মারা যান। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওই বসতি থেকে সাঁওতালদের উচ্ছেদ করে। 

এসব ঘটনায় সাঁওতালদের পক্ষে স্বপন মুরমু বাদি হয়ে ওই বছরের ১৬ নভেম্বর ৬০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি দেখিয়ে মামলা করেন। ২৬ নভেম্বর থোমাস হেমব্রম বাদি হয়ে ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে অজ্ঞাত দেখিয়ে আরেকটি মামলা করেন।

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়