• মাধুকর প্রতিনিধি
  • তারিখঃ ১০-১১-২০২২, সময়ঃ সকাল ১১:২১
  • ৫১ বার দেখা হয়েছে

ইট ভাটায় পুরছে কাঠ উজার হচ্ছে বনভূমি।

ইট ভাটায় পুরছে কাঠ উজার হচ্ছে বনভূমি।

আবুল কালাম আজাদ, পলাশবাড়ী  ►

দেশে প্রায় ৮ হাজার ইটভাটায় বছরে পোড়ানো হচ্ছে ৩ হাজার ২০০ কোটির বেশি ইট।এ-র মধ্যে ২ হাজারের মতো ইট ভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কাঠ। বিপুল পরিমাণে কাঠের জোগান দিতে গিয়ে বিলীন হচ্ছে বনভূমি। ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ। দূষিত হচ্ছে বায়ু। একই সঙ্গে এসব ইটভাটায় মাটির জোগান দিতে গিয়ে উর্বরতা হারাচ্ছে কৃষিজমি।হুমকির মুখে খাদ্য নিরাপত্তা। এদিকে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি টেকসই (এসডিজি)উন্নয়ন লক্ষ্য মাত্রা অর্জনে বর্তমান সরকার ইটের ব্যবহার কমিয়ে ব্লকের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেও তার গতি পাচ্ছে না।পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে সরকারি নির্মান কাজে শতভাগ ব্লক ব্যবহার করা নিশ্চিত করা ও পর্যায়ক্রমে বেসরকারি নির্মান কাজে ও ব্লকের ব্যবহার বাড়াতে চায় সরকার। সে কারনে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন আইনে ইটভাটা স্থাপনে নানা বিধিনিষেধের পাশাপাশি ব্লক ব্যবহারে উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে প্রচারণার অভাবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না ব্লক। কমছে না ইট ভাটার সংখ্যা। উল্টো আইন কে পাশ কাটিয়ে প্রতিনিয়ত অবৈধভাবে বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে ইটভাটা।

ইট প্রস্তুতকারকদের তথ্যানুযায়ী,বর্তমানে সারা দেশে ৭ হাজার ৯০২ টি ইটভাটার কার্যক্রম চলছে। এ-র মধ্যে ৩ হাজার ২০০ ইট ভাটাই অবৈধ। এ-র মধ্যে ২ হাজার ইট ভাটায় অবৈধভাবে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। সহজলভ্যতার কারণে কাঠের ব্যবহার এখনো বেশি হচ্ছে ইটভাটা গুলোয় গাইবান্ধা জেলায় শতাধিক ইট তৈরির ভাটা রয়েছে যার অধিকাংশ সড়ক-মহাসড়কেরের পাশ দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে।প্রতিটি ইট ভাটা কৃষি জমির উপর তৈরি এর পার্শ্বে রয়েছে আবাসিক এলাকা, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান। যা ইট ভাটার তৈরির মধ্যে পড়ে না। রংপুর-বগুড়া মহাসড়ক,পলাশবাড়ী-গাইবান্ধা রাস্তা,ঢোলভাঙ্গা-আমলাগাছী রাস্তা দৃশ্যমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রসায়ন বিভাগ এবং যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আর্কাডিসের যৌথ গবেষণার তথ্য বলছে, বিশ্বের ৭৫ শতাংশ ইট এশিয়ার ৫ টি দেশ তৈরি করে। চীন ৫৮ শতাংশ, ভারত ১২ শতাংশ, পাকিস্তান ২.৫ শতাংশ, ভিয়েতনাম ১.৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ১ শতাংশ ইট তৈরি করে।

এদিকে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অধিকাংশ দিন ঢাকা বিশ্বের দূষিত নগরীর তালিকার শীর্ষে থাকছে। এ-র পিছনে ইট ভাটা কে দায়ী করছে।গত ৩১ অক্টোবর ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা সিমেন্টের ব্লক ব্যবহারের প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলেন, ঢাকা শহরের ৫৬ শতাংশ বায়ু দূষণ হচ্ছে ইট ভাটার কারণে। এ ছাড়া রাস্তার ধূলাবালির কারণে ১৮ শতাংশ ও যানবাহনের কারণে দূষণ হচ্ছে ১০ শতাংশ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১৫ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড ইটখোলা থেকে নির্গত হয়ে বায়ুমন্ডলে মিশছে। বাংলাদেশের মোট কালো ধোঁয়ার সর্বোচ্চ ৩৮ শতাংশ নির্গমন করছে যানবাহন। পরিবেশ দূষণের কারণে দক্ষিণ এশিয়া সহ বিশ্বের অনেক দেশ সনাতন পদ্ধতির ইট ভাটা বন্ধ করে দিয়েছে।

বাংলাদেশের ' ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন আইন 'করেছে ২০১৩ সালে। ২০১৯ সালে এ-ই আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধন করে ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক কারখানা কে উৎসাহিত করা হয়। আইনে বলা হয়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং উন্নয়নের স্বার্থে আধুনিক প্রযুক্তির ইট ভাটা অর্থাত জিগজ্যাগ ক্লিন, হাইব্রিড হফম্যান ক্লিন,ভার্টিক্যাল শফট ক্লিন,টানেল ক্লিন বা অনুরূপ উন্নততর কোনো প্রযুক্তির ইট ভাটা স্থাপন করতে হবে।তাছাড়া আবাসিক, জনবসতি, সংরক্ষিত এলাকার বনভূমি ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ইট ভাটা করা যাবে না।এছাড়া সরকারি বনাঞ্চলের সীমারেখা থেকে দুই কিলোমিটার দূরে করতে হবে।পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র, জেলা প্রশাসকের অনুমোদন না নিয়ে ইটভাটা চালু করা যাবে না। আর এ অমান্য করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

তবে অধিকাংশ ইটভাটা মালিক এসব আইনের তোয়াক্কা না করে সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে দেদার তাদের অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। নিষিদ্ধ হওয়ার পর ও ইটভাটায় প্রকাশ্য পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। বিশেষজ্ঞদের মতে,সনাতন ইটভাটা কেবল পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্যই ক্ষতিকর নয়, এর ফলে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। ইট তৈরিতে প্রতি বছর ১২৭ কোটি সিএফটি মাটি প্রয়োজন হচ্ছে। আইনে বিধিনিষেধ থাকলেও কৃষি জমি, জলাশয় এবং নদী থেকেই নেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ মাটি। উপরিভাগের মাটি দিয়ে ইট তৈরি করায় উর্বরতা হারাচ্ছে কৃষি জমি।এতে হুমকিতে পড়ছে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা। একইভাবে নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে বন উজার হচ্ছে, হচ্ছে ভূমিধস,ভাঙন ও মাটি ক্ষয়।

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়