• মাধুকর প্রতিনিধি
  • তারিখঃ ১২-১২-২০২২, সময়ঃ দুপুর ০২:১৮
  • ৩৫১ বার দেখা হয়েছে

চরাঞ্চলের একমাত্র ভরসা ঘোড়ার গাড়ি

চরাঞ্চলের একমাত্র ভরসা ঘোড়ার গাড়ি

ভবতোষ রায় মনা ►

শুকনো মৌসুমে চরাঞ্চলের মানুষ ও প্রয়োজনীয় মালামাল বহনের একমাত্র ভরসা এখন ঘোড়ার গাড়ি। চরের উৎপাদিত বাদাম, ভুট্টা, মসুর ডাল, বোরো ধান, মিষ্টি আলুসহ বিভিন্ন পণ্য ঘোড়ার গাড়িতে বহন করে বিক্রি করতে বাজারে নিয়ে যাচ্ছে চরের কৃষকরা। এ চিত্র ফুলছড়ি উপজেলার ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চলের। 

ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর কারণে একবারে বিচ্ছিন্ন গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর, এরেন্ডাবাড়ি, ফুলছড়ি ও গজারিয়া ইউনিয়ন। এসব এলাকায় রাস্তাঘাট নেই বললেই চলে। দুর্গম এ চরাঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌকা আর শুকনো মৌসুমে চরাঞ্চলের মালামাল বহনের একমাত্র ভরসা ঘোড়ার গাড়ি। আর এ গাড়ি চালিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছে প্রায় দুই শতাধিক পরিবার। উল্লেখিত ইউনিয়নগুলোর খাটিয়ামারি, জিগাবাড়ি, পেপুলিয়া, গাবগাছি, গলনা, জিয়াডাঙ্গা, সাতারকান্দি, রসুলপুর, খাটিয়ামারি, ফুলছড়ি, টেংরাকান্দি, বাজে ফুলছড়িসহ প্রায় ৫০টি এলাকায় কোনো যানবাহন চলাচলের উপায় না থাকায় চরের মানুষজন বালুময় পথে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন।

এমনকি তাদের উৎপাদিত পণ্য মাথায় করে আনা-নেওয়া করতে হত। এখন চরাঞ্চলের মানুষের মালামালের বাহন হিসেবে ঘোড়ার গাড়িই একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চরাঞ্চলের চাষীদের উৎপাদিত ফসলও জমি থেকে তুলে বাড়ি নেওয়া ও উপজেলা সদরে বিক্রির জন্য নদীর ঘাটে নিয়ে যাওয়ার েেত্র ভরসা ঘোড়ার গাড়ি।

পানি কমে যাওয়ায় বর্তমানে ব্রহ্মপুত্র এখন মরুভূমিসম। এতে উপজেলার সাতারকান্দি, রসুলপুর, খাটিয়ামারি, ফুলছড়ি, টেংরাকান্দি, বাজে ফুলছড়িসহ চরের প্রায় ৫০টি গ্রামবাসীর লোকজন যাতায়াত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল ঘোড়ার গাড়িযোগে বহন করছেন। এতে একদিকে যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হয়েছে, অন্যদিকে ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে আর্থিকভাবে স্বচ্ছলতা এসেছে পরিবারগুলোতে।

ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের রসুলপুর চরের এক ঘোড়ার গাড়ির চালক আব্দুল রইফ মিয়া (৩৫) বলেন, আমরা গরিব মানুষ, কাম না করলে খাবো কী? একবেলা কাম করলে আরেকবেলা কাম করতে পারি না। সংসার চালানোর জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়াই ঘোড়ার গাড়ি চালাই। দৈনিক ৭০০-৮০০ টাকা উপার্জন করি। ঘোড়ার খাবারের জন্য প্রতিদিন ব্যয় করতে হয় ২০০-২৫০ টাকা। বাকি টাকায় চলে সংসার। তিনি আরও বলেন, দুই বছর আগেও এই চরাঞ্চলে ১৫-২০টা ঘোড়ার গাড়ি ছিল। আর এখন এই ইউনিয়নে ৩০-৪০টা ঘোড়ার গাড়ি হয়েছে। দিন দিন ঘোড়াগাড়ির চাহিদা বাড়ছে।

ফুলছড়ি উপজেলার পেপুলিয়া এলাকার ঘোড়ার গাড়ির চালক আব্দুস সালাম বলেন, দুই বছর ধরে ঘোড়ার গাড়ি চালাচ্ছি। দিনে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা কামাই হয়। তা দিয়ে সংসার ভালোই চলছে। শুকনো মৌসুমে আয়ের পরিমান আরও বাড়ে। গজারিয়া ইউনিয়নের কৃষক হাফিজুর রহমান বলেন, আগে মাথায় করে কৃষিপণ্য হাট-বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতাম। কিন্ত এখন ঘোড়ার গাড়ি হওয়ায় খুব সহজে মালামাল পরিবহন করা যায়। এক মণ ভুট্টা বা ধান বহন করতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা ভাড়া দিয়ে মালামাল গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া যায়।

ফুলছড়ি চরের চর বাজে ফুলছড়ির বাসিন্দা আব্দুল মজিদ। লোকে তাকে ‘ঘোড়া মজিদ’ নামে চেনে। তার ছেলে শাহীন মোল্লা জানালেন, ঘোড়া লালন-পালন করে তারা পারিবারিক সমৃদ্ধি ঘটিয়েছেন। শুধু নিজেরা সচ্ছল হননি। তাদের দেখাদেখি আরো বহু লোক ঘোড়া পালন করে সচ্ছল হয়েছেন। তিনি আরো জানান, ঘোড়া লালন-পালন করা কঠিন কিছু নয়।

গরু যা খায় না, ঘোড়া তাও খেয়ে থাকে। এছাড়া এখানে ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে লালন-পালনের একটা বাড়তি সুবিধা রয়েছে। বর্ষাকালে ঘোড়াওয়ালারা পানি পাড়ি দিয়ে জেগে থাকা চরে অনেক ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে আসেন। ঘোড়া জলমগ্ন ঘাসও খায়। শাহিন মিয়া জানান, তারা এলাকার পুরাতন ঘোড়া পালনকারী। এ কারণে তাদের কাছে লোকজন ঘোড়া লালন-পালনের কথা জানাতে চান।

পিপুলিয়া গ্রামের জাহিদুল হক জানান, চরের বিস্তীর্ণ বালু চরে ধান, পাট, বাদাম, মরিচ, মিষ্টি কুমড়ার চাষ হচ্ছে। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করা চরের সংগ্রামী মানুষ যমুনার পাড়ে ফলাচ্ছেন সোনার ফসল। সেই ফসল ঘরে আনার একমাত্র বাহন ঘোড়ার গাড়ি।

ফুলছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান মন্ডল বলেন, নদী ভাঙনের এলাকার যতো মালামাল সব পরিবহন করা হয় ঘোড়ার গাড়িতে। ফজলুপুর, ফুলছড়ি ও এরেন্ডাবাড়ি ইউনিয়নসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৪ শতাধিক ঘোড়ার গাড়ি চলাচল করছে। আমার ফুলছড়িতেই প্রায় দেড় থেকে দুইশ গাড়ি রয়েছে। এদের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দরকার।

গাইবান্ধা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ মাছুদার রহমান সরকার জানান, ঘোড়া একটি নিরীহ প্রাণী। এর তেমন রোগবালাই নেই। খাবারেও খুব একটা বাছ-বিচার নেই। ঘোড়ার গাড়ি করা যেমন লাভজনক তেমিন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ঘোড়ার খামার করাও লাভজনক। এসব চরের অবারিত মাঠ ঘোড়ার উপযুক্ত চারণভূমি। সেখানে ঘোড়া পালন করে অনেকেই লাভবান হচ্ছেন। বহু মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে।

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়