
অনলাইন ডেস্ক ►
আগামী আগস্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান সফরে যেতে পারেন। এই সফরে দেশটির সঙ্গে গড়ে ওঠা বহুমাত্রিক সম্পর্কের গভীর বিকাশ প্রাধান্য পাবে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আগামী অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তুরস্ক সফর করবেন। এটা মোটামুটি নিশ্চিত। এর আগে আগামী সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সম্মেলনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফর করবেন।
ওই সময়ে ইউরোপের কোনো দেশে সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। তারও আগে আগামী মাসে প্রধানমন্ত্রী জাপান সফরে যেতে পারেন। চলমান জুলাইয়ের শুরুতে জাপানের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক সংসদীয় উপমন্ত্রী শিমাদা তোমাকির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে এসে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানায়।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আওতায় চলমান বৈশ্বিক উত্তেজনায় ঢাকা সবার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে পথ চলতে চায়, জাপান সফরে বিশ্বের কাছে এই বার্তার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হবে। অন্যদিকে জাপানের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ঢাকা টোকিওর সঙ্গে আসন্ন সফরে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে গুরুত্ব দেবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত তিন ফেব্রুয়ারি জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর বিষয়ে চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। চুক্তি স্বাক্ষরের পর গত ২১ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উত্থাপিত এই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসমর্থন করা হয়।
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরই এই চুক্তি বাস্তবায়নের মূল পথ উন্মুক্ত হয়েছে। আসন্ন সফরে এই বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। এই বিষয়ে গত ফেব্রুয়ারি মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের আলোচনায় প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয় এসেছে। আমরা বলেছি যে এটা যেন স্মুথলি চলে। দক্ষ অভিবাসন নিয়ে আলাপ করেছি। এ ছাড়া আমাদের আলোচনায় দুই পক্ষের সম্পর্ক, ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যু, কৌশলগত অংশীদারিত্ব, মাতারবাড়ী প্রকল্পসহ একাধিক বিষয়ে আলাপ হয়েছে।
আসন্ন জাপান সফরে বাংলাদেশি পণ্যের জাপানের বাজারে যেন আরও প্রবেশাধিকার পায় সেই বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। এই ইস্যুতে গত ৬ ফেব্রুয়ারি দুই দেশ বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই করেছে, যা একটি ঐতিহাসিক অর্জন। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি।
এই চুক্তির ফলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হচ্ছে। ইপিএ চুক্তির মাধ্যমে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের প্রায় ৭ হাজার ৪০০ পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন, উৎপাদন ও রফতানি আরও সহজ হচ্ছে।
জাপানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এই অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির জন্য একটি টেমপ্লেট (মানদণ্ড নির্ধারক) হিসেবে কাজ করবে। এই চুক্তিকে সামনে রেখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করা সহজ হবে।
বৈশ্বিক বাণিজ্যে সুরক্ষাবাদের প্রবণতা বাড়ছে, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থাভিত্তিক মুক্ত বাণিজ্যের যে ধারা ছিল, সেখান থেকে বৈশ্বিক বাণিজ্য এখন ভিন্ন পথে যাচ্ছে। অনেক দেশ বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করছে এবং দেয়াল তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে ইপিএ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের প্রেফারেনশিয়াল ট্রেড অ্যাক্সেস বাংলাদেশের বাজার সম্প্রসারণ নিশ্চিত করছে এবং শূন্য বা খুব কম শুল্কে বিদেশি বাজারে পণ্য রফতানির সুযোগ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য জাপানের সঙ্গে এই ইপিএ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসন্ন সফরে এই চুক্তির আলোকে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক নিয়ে গত মার্চ মাসে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত এইচ ই সাইদা শিনিচি বলেন, আমরা একটি জরিপ করেছি, যেখানে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগকারীদের বর্তমান মানসিকতা এবং ভবিষ্যতের ভাবনার একটি স্বচ্ছ প্রতিফলন ফুটে উঠেছে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং একটি নির্বাচিত সরকারের উপস্থিতি বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় ইতিবাচক সংকেত। জাপানের জন্য বাংলাদেশের বাজার বিশাল সম্ভাবনাময়। বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এমন অধিকাংশ জাপানি কোম্পানি আগামী ১ থেকে ২ বছরের মধ্যে তাদের ব্যবসা আরও সম্প্রসারণ করতে চায়।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র (১২০০ মেগাওয়াট), যমুনা রেলওয়ে ব্রিজ বাস্তবায়নসহ বাংলাদেশের একাধিক মেগা প্রকল্পের সঙ্গে জাপান জড়িত। এসব প্রকল্প নিয়েও আসন্ন সফরে দুই পক্ষের মধ্যে আলাপ হবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত গত ২০ জুন সাংবাদিকদের বলেন, জাপানি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনায় আমাদের তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধনের বিষয়টি অন্যতম প্রধান ইস্যু ছিল। আমরা ১৬ ডিসেম্বর এটি উদ্বোধন করতে চাই। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ জাপানে ১.৪১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রফতানি করেছে। এর বিপরীতে জাপান থেকে আমদানি হয়েছে প্রায় ১.৫১ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্য।