• মাধুকর প্রতিনিধি
  • তারিখঃ ৪-১২-২০২২, সময়ঃ বিকাল ০৩:৩২
  • ১৪০ বার দেখা হয়েছে

জীবনের শেষাংশে রিফ্রেশমেন্টেরও প্রয়োজন আছে

জীবনের শেষাংশে রিফ্রেশমেন্টেরও প্রয়োজন আছে

খ ম মিজানুর রহমান রাঙ্গা ►

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। জন্ম গ্রহণের পর মায়ের কোল থেকে শুরু করে অনেক গুলো ধাপ পেরিয়ে মানুষ জ্ঞান বুদ্ধি চর্চার সন্ধান পায়। মায়ের ভাষা শিার পর শুরু হয় পাঠশিা। বিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠিানিক শিা থেকে শুরু করে সকল শিার পাঠ চুকিয়ে যেকোন ভাবেই একটি কর্মজীবন শুরু হয়। চরম ব্যস্ততায় কাটতে থাকে মানুষের জীবন। জীবনের চাহিদার কারনেই দৌঁড়াতে হয় মানুষকে। আর এ দৌঁড়ে জীবন চলার পথে সফলতা পাওয়া বা বিফল হওয়া, যেটাই হোক না কেন, ব্যস্ততার যেন কমতি থাকে না। বর্তমানে ব্যস্ততা বিহীন জীবন কল্পনাতীত। বুদ্ধির পর থেকে শেষ জীবন পর্যন্ত এই ব্যবস্ততা ও দৌঁড়ঝাপের কোন শেষ থাকেনা। 

আমাদের সমাজে দেখা যায়, বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও কাজ থামান না অনেকে। অনেকটা স্বভাবে পরিনত হয়ে যায় এই ব্যস্ততা। কাজের মধ্যে সময় অতিবাহিত করলে যদিও যেকোন মানুষের মানসিক ভাবে সুস্থ থাকার একটা সুযোগ থাকে। তবে শেষ বয়সে কাজের বেশি চাপে হিতে বিপরীতও ঘটে। নিজেকে ব্যাপক কর্মোঠ ও শক্তিশালী মনে করতে গিয়ে শেষ বয়সে অনেককে চরম মুল্য দিতে হয়। কারণ হিসেবে দেখা যায়, বৃদ্ধ বয়সে অনেকে শরীর ও মনের অতিরিক্ত চাপ নিয়ে তা আর সহ্য করতে পারেন না। শেষ সময়ে পরে যান এলোমেলোতে। ধাবিত হতে থাকে ভঙ্গুর জীবনের দিকে।

শেষে তাকে নিয়েই পরিবারের সকলকে ব্যস্ত থাকতে হয়। সমাজে এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। আসলে এক সময়ের কাজ, আরেক সময়ে হয় না। সবকিছুরই একটা সময় আছে। বয়স আছে। সারাজীবনের ব্যস্ততা শেষে রিফ্রেশমেন্টেরও দরকার আছে। সেটাই অবসর। অবসর নিতে হয় নিজের প্রয়োজনেই। অবসরেরও প্রয়োজন আছে। এটা জীবনেরই একটা অংশ। অবসর সংক্রান্ত দুটি উদাহরণ দিয়ে আজকের লেখা শেষ করবো। ২৭ বছর কারাভোগের পর ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রয়ারী বেড়িয়ে এসে ১৯৯৪ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে মতায় ফেরেন দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসেন ম্যান্ডেলা। 

১৯৯৭ সালে তিনি সে দেশে গণতন্ত্র ফেরান। ১৯৯৯ সালে সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি সে সময়ের সাধারণ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিরত থাকেন। প্রার্থী হননি। সময় থাকতেই নেলসেন ম্যান্ডেলা বুঝতে পেরেছিলেন। বুঝতে পেরেছিলেন অবসর নিতে হবে। কারান্তরীনের পর তিনি যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, শেষ বয়সে তা আর ধুলোয় মেশাতে চাননি। নিজেকে পঁচানোর হাত থেকে রা করেছিলেন ম্যান্ডেলা। এমনই আরেকটি উদাহরণ অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন।

বাংলা সিনেমায় সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সম্মান পাওয়া মহানায়িকা সুচিত্রা সেন মোট ৬১টি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। ১৯৭৮ সালে তিনি অভিনয় থেকে সরে যান। জীবনের শেষকালের দির্ঘ ৩৫টি বছর তিনি লোকচুর আড়ালে চলে যান। ৮২ বছর জীবনের প্রায় তিন যুগ তার চেহারা কেউ দেখতে পারেন নি। অনেক চেষ্টা করেও এই মহানায়িকার স্বাক্ষাৎ পাননি কেউ। লোক সমাগমে যেতে হবে, এ কারনে এমনকি জাতীয় চ্চলচিত্র পুরস্কারও নিতে যাননি তিনি। জীবন সায়ান্নে পুরোটাই আড়াল করে ফেলেছিলেন নিজেকে। নেলসেন ম্যান্ডেলার ন্যায় সুচিত্রা সেনও বুঝতে পেরেছিলেন, আসলে জীবনের জন্য অবসরও প্রয়োজন আছে। থামতে হয় নিজে থেকেই। থামতে না জানলে যে পঁচার আশঙ্কা থাকে, তা বোঝার মতা ছিলো তাদের। 

কিন্তু গত ১৯ নভেম্বর মালেশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় মানুষটি নিজেকে পঁচালেন। অবিসংবাদিত এই নেতা দীর্ঘ সময় মতায় থেকে পাল্পে দিয়েছিলেন মালেশিয়াকে। আধুনিক মালেশিয়ার এই নায়কে পরিনত হয়েছিলেন এই নেতা। অথচ নির্বাচনে তার দল একটি আসনও পায়নি। এমনকি মাহাথির মোহাম্মদ নিজের আসনটিও পাননি। জামানত হারিয়েছেন। তিনি  বুঝতে পারলেন না, ৯৭ বছর বয়সে থামাতে হবে নিজেকে। আসলে পঁচার আগে সময় থাকতেই যে প্রস্থান হতে হবে, তা কোন ভাবেই বোঝেন নি এই নেতা। তাই সঠিক সময়েই থামতে হবে। থামাতে হবে নিজেকেই। এটি একটি বড় শিা। একটি বড় বার্তা। তাই নিজেকে উদ্ভাসিত করতে, নিজের মান সম্মান, খ্যাতি ও যস ঠিক থাকতেই অতি স্মাটনেসের ভূত মাথা থেকে ছাড়ানো উচিৎ। ব্যস্ত জীবনের শেষাংশে একটু রিফ্রেশমেন্টেরও প্রয়োজন আছে। প্রয়োজন আছে চিন্তামুক্ত একটি সরল, সুন্দর, ও সুস্থ জীবনযাপনের। এতে নিজের জন্যই মঙ্গল।
লেখক: গণমাধ্যম ও উন্নয়ন কর্মী, mizan.ranga@gmail.com

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়