Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ৩ ঘন্টা আগে
ফটো কার্ড

ফুটবলের নতুন পরাশক্তি হওয়ার পথে মরক্কো

ফুটবলের নতুন পরাশক্তি হওয়ার পথে মরক্কো

অনলাইন ডেস্ক ►
বিশ্ব ফুটবলের আগামী পরাশক্তি হয়ে ওঠার সব সম্ভাবনা রয়েছে মরক্কোর; বক্তব্যটি আপাতদৃষ্টিতে বেশ সাহসী কিংবা কল্পনাপ্রসূত মনে হলেও মরক্কোর ফুটবল নিয়ে মাঠপর্যায়ের উন্মাদনা আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা যারা খুব কাছ থেকে দেখেছেন, তাদের কাছে এটি মোটেও বাড়িয়ে বলা কোনো কথা নয়।

রয়্যাল মরক্কান ফুটবল ফেডারেশনের (আরএমএফএফ) সাবেক টেকনিক্যাল অপারেশন ডিরেক্টর নিল ওয়ার্ড বলেছেন, ২০২২ সালের বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে মরক্কো যখন সেমিফাইনালে উঠেছিল, তখন পুরো রাবাত শহর যেভাবে উদযাপনে মেতেছিল, তাতে শামিল হয়েছিলেন স্বয়ং দেশের রাজাও। সেই জোয়ার যে কেবল সাময়িক কোনো ঝলক ছিল না, তার প্রমাণ মিলছে চলমান বিশ্বকাপেও। মরক্কো আবারও ইতিহাস গড়ার লক্ষ্যে কোয়ার্টার ফাইনালের মঞ্চে ফ্রান্সের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপের অন্যতম সহ-আয়োজক দেশ হিসেবে মরক্কো ফুটবল বিশ্বকে বার্তা দিয়ে চলেছে যে, তারা অনেক দূর যেতে প্রস্তুত।

মরক্কো ফুটবলের এই উত্থান কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয় বরং এটি সুদূরপ্রসারী জাতীয় আকাঙ্ক্ষারই এক বাস্তব রূপ। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে দেশটির ফুটবলে চলেছে বিপুল অঙ্কের পরিকল্পিত বিনিয়োগ, যার নেপথ্যে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের। বিশ্বমানের অত্যাধুনিক ট্রেনিং সেন্টার, ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি, আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, স্টেডিয়ামের আধুনিকায়ন থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ে হাজার হাজার অপেশাদার পিচ তৈরি করা হয়েছে এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে।

ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে খেলে অভ্যস্ত তারকা ফুটবলাররা যখন জাতীয় দলে আসেন, তখন দেশের এমন সুযোগ-সুবিধা দেখে তাদের পেশাদারত্বের স্পৃহা আরও বেড়ে যায়। যদিও দেশের একটি বড় অংশ এই বিপুল অর্থ শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের দাবি তুলেছিল, তবে রাজপ্রাসাদ ফুটবলের পাশাপাশি ২০২৬ সালের বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যেও বড় অঙ্কের বরাদ্দ বাড়িয়ে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। ফুটবলের এই বিনিয়োগ মূলত আন্তর্জাতিক মঞ্চে মরক্কোর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের এক অনন্য হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

মরক্কোর এই অভাবনীয় সাফল্যের আরেকটি বড় চাবিকাঠি হলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তাদের প্রবাসী জনগোষ্ঠী বা ডায়াসপোরা। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৫০ লাখের বেশি মরক্কান নাগরিক বিদেশে বসবাস করেন। ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, জার্মানির মতো ফুটবল পরাশক্তি দেশগুলোতে জন্ম নেওয়া মরক্কান বংশোদ্ভূত উদীয়মান প্রতিভাদের খুব ছোটবেলা থেকেই খুঁজে বের করার জন্য পূর্ণকালীন স্কাউট নিয়োগ করেছে আরএমএফএফ। লা লিগার বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামালকে দলে টানার জন্য মরক্কো যেমন সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিল, তেমনই চলতি বিশ্বকাপের দলেও এর বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে। 

বর্তমান স্কোয়াডের ২৬ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ১৯ জনই জন্মসূত্রে প্রবাসী। ফরাসি অনূর্ধ্ব দলে খেলা আইয়ুব বুয়াদ্দির মতো তরুণ তুর্কিরা নিজের দেশের টানে মরক্কোর জার্সি গায়ে জড়িয়েছেন। এই ফুটবলারদের কাছে মরক্কো কোনো দ্বিতীয় বিকল্প নয় বরং তারা হৃদয়ের গভীর থেকে নিজেদের মরক্কান মনে করেন এবং সেই আবেগই মাঠে ঢেলে দেন।

তবে কেবল প্রবাসীদের ওপর নির্ভর করে নয়, মরক্কোর ফুটবল কর্তাদের লক্ষ্য এখন দেশের ভেতরের একাডেমিগুলো থেকে সমপরিমাণ আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার তৈরি করা। ফেডারেশনের সাবেক টেকনিক্যাল ডিরেক্টর ক্রিস ভ্যান পুইভেল্ডের পরিকল্পনা ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে দলে প্রবাসী ও স্থানীয় ফুটবলারদের অনুপাত সমান সমান করা। ফুটবলীয় এই কাঠামোগত পরিবর্তনের সুফল আসতেও শুরু করেছে। ২০২৩ সালে অনূর্ধ্ব-২০ দল ব্যর্থ হওয়ার পর কোচের চাকরি বাঁচানো নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, ধৈর্য আর সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে সেই একই কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবির অধীনে মরক্কো ২০২৫ সালের অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয় করে। এরপরই সিনিয়র দলের দায়িত্ব পান ওয়াহবি। 

তারুণ্যনির্ভর এই মরক্কো দলটি চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম তরুণ দল হিসেবে খেলছে। কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল দিয়ে যে স্বপ্নের অক্সিজেন মরক্কোর বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা এখন দেশটির ফুটবল কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহিত হচ্ছে। ২০৩০ সালের যৌথ বিশ্বকাপ সামনে রেখে তারা শুধু দৃষ্টিনন্দন স্টেডিয়ামই বানাচ্ছে না, বরং ভেতর থেকে গড়ে তুলছে ফুটবলের এক অপরাজেয় সাম্রাজ্য।

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad