Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ৯ ঘন্টা আগে
  • ৪৪ বার দেখা হয়েছে
ফটো কার্ড

বিদায়ী প্রজন্মের শেষ আকুতি: এক টুকরো শান্তি কি শুধুই একলা নিজের হয়?

বিদায়ী প্রজন্মের শেষ আকুতি: এক টুকরো শান্তি কি শুধুই একলা নিজের হয়?

প্রকৌশলী কে এম জয়নুল আবেদীন ►
আজ ২১শে সেপ্টেম্বর, বিশ্বজুড়ে আবারও একটি শান্তিনিকেতনের খোঁজে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস। জীবনের শেষ সীমান্তে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর অশীতিপর (৮৫ বছর বয়সী) প্রবীণ সমাজ আজ এক গভীর নৈতিক দায় অনুভব করছে। আজ তারা এই দিনটিকে কোনো মেকি উৎসবে নয়, বরং বুকের ভেতর জমে থাকা এক মহাসমুদ্র হতাশার কথা বিশ্ববাসীকে জানাতে চায়। দীর্ঘ পঁচাশী বছরেরও বেশি সময় ধরে এই জ্যেষ্ঠ প্রজন্ম মানব ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুতগতির রূপান্তর দেখেছে।

তারা দেখেছে কীভাবে মানুষ পরমাণু ভেঙেছে, আকাশ জয় করেছে আর পুরো পৃথিবীকে এক নিমেষে গেঁথে ফেলেছে ইন্টারনেটের এক অদৃশ্য সুতোয়। অথচ, জ্ঞানের এই জোয়ার আর প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের দিনেও, যে বিশ্বশান্তির জন্য তারা আজীবন তৃষ্ণার্ত ছিল, তা আজও এক মরীচিকা হয়েই রয়ে গেল। পরপারের ডাক শোনার আগে আজ বিশ্বের প্রবীণদের এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে-একটি শান্তিময় ও সুন্দর পৃথিবীর ছায়া দেখার সৌভাগ্য হয়তো এই বিদায়ী প্রজন্মের আর হলো না।

এই গভীর বেদনা মানুষের অক্ষমতা থেকে আসেনি, এসেছে মানুষের সুগভীর বিবেচনাবোধ আর বৈশ্বিক প্রজ্ঞার চরম অভাব থেকে। আমরা আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান শাসকেরা, যারা সবচেয়ে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর ভাগ্যবিধাতা এবং যাদের হাতের মুঠোয় রয়েছে পৃথিবীর সব তথ্য-তারাও যেন এক অদ্ভুত অন্ধত্বে ভুগছেন। এই নেতাদের মূল চাওয়া এবং তাদের দেশের মানুষের একমাত্র প্রত্যাশা আজ একটি অতি ক্ষুদ্র এবং স্বার্থপর মন্ত্রে আটকে গেছে-তা হলো, "আগে আমাদের শান্তি"।

কত বড় দুর্ভাগ্য যে, চরম জ্ঞানের আলোয় বসেও তারা বুঝতে পারছেন না যে, এই আধুনিক যুগে কেবল নিজের দেয়ালটুকু বাঁচিয়ে শান্তিতে থাকার চিন্তা একটি আত্মঘাতী বিভ্রম মাত্র। কোনো দেশ, সে যতই বিত্তবান হোক বা মারণাস্ত্রে বলীয়ান হোক না কেন, একা কখনো শান্তিতে থাকতে পারে না। এই পৃথিবীর কোনো একটি প্রান্তকে আজ আর একটি বিচ্ছিন্ন, নিরাপদ শান্তির দ্বীপ বানিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আমাদের চারপাশের চারিয়ে যাওয়া মানুষের তৈরি যুদ্ধ, হানাহানি আর ক্ষমতার লড়াই-ই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। যখন বিশ্বের এক কোণে যুদ্ধ আর ক্ষুধার আগুন জ্বলে, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো সেই আগুনের আঁচ সবার আগে টের পায়।

মন্দা, উদ্বাস্তু মানুষের হাহাকার আর বৈশ্বিক নিরাপত্তাহীনতা কোনো দেশের কাঁটাতার চেনে না। শান্তি তো কোনো ঘরের কোণে জমিয়ে রাখার বস্তু নয়; একে সবার মাঝে বিলিয়ে দিতে হয়, নইলে তা একদিন সবার জন্যই ভেঙে কাঁচের মতো চুরমার হয়ে যায়। তবুও, বিগত শতাব্দীর সবচেয়ে ঘোর অন্ধকার দিনগুলোর বুক চিরে মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর অলৌকিক ক্ষমতা দেখা এই প্রবীণ সমাজ, তাদের হতাশাকে পুরোপুরি নিরাশায় রূপ দিতে চায় না। নিজেদের জন্য এক চিলতে শান্তির আকাশ দেখার আশা হয়তো তারা ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু একটি শেষ ইচ্ছা এই পড়ন্ত বেলাতেও তারা মনে-প্রাণে আঁকড়ে ধরে রেখেছে।

এই ধুলোর পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার আগে বিশ্বের প্রবীণরা মানুষের চেতনার একটা মৌলিক জাগরণ দেখে যেতে চায়। তারা দেখে যেতে চায়, পৃথিবীর শক্তিশালী দেশের মানুষ ও তাদের শাসকেরা অন্তত এইটুকু বুঝতে পেরেছে যে-একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পৃথিবী গড়ে তোলা আজ আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এই মানবজাতির টিকে থাকার একমাত্র উপায়। বিশ্বনেতারা যদি কোনো উদারতা বা পরার্থপরতা থেকে এই শান্তির পথ খুঁজে নিতে নাও পারেন, তবে অন্তত তারা যেন তাদের নিজেদের রক্ত, তাদের সন্তান আর আগামী প্রজন্মের প্রতি থাকা এক আদিম, আদিগন্ত ভালোবাসার টানে তা করেন।

এই পৃথিবীর প্রতিটি মা-বাবা, দাদা-দাদি বা নানা-নানি-তাদের দেশ, জাতি বা ধর্ম যা-ই হোক না কেন-সবার বুকের ভেতর একটিই চিরন্তন প্রার্থনা থাকে: তাদের সন্তানরা যেন বারুদের গন্ধহীন, এক হিংসামুক্ত আলোয় বড় হতে পারে। আমরা যদি এখনই যুদ্ধের এই চোরাবালি থেকে পথ না বদলাই, তবে শক্তিশালী নেতাদের সন্তান আর উন্নয়নশীল দেশের অসহায় শিশুদের জন্য ঠিক একই রকম এক অভিশপ্ত ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।

শেষ নিঃশ্বাসটুকু ফেলার আগে যদি দেখা যায় বিশ্ববাসী এই পরম সত্যে জেগে উঠেছে, তবে এই জ্যেষ্ঠ প্রজন্মের বুকের সব গভীর দীর্ঘশ্বাস এক পরম শান্তিতে জুড়িয়ে যেত। এটি হতো বর্তমান প্রজন্মের কাছ থেকে এক বিদায়ী প্রজন্মের পাওয়া জীবনের শ্রেষ্ঠতম উপহার। তখন পৃথিবীর প্রবীণ আত্মারা এক বুক তৃপ্তি নিয়ে এই ধরাধাম থেকে বিদায় নিতে পারবে-এই ধ্রুব আশাটুকু বুকে নিয়ে যে, মানুষ অবশেষে নিজের ধ্বংসের পথ থেকে ফিরে এসে এক যৌথ, চিরস্থায়ী আলোর দিকে পা বাড়িয়েছে।

লেখক ঃ সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, গণপূর্ত বিভাগ এবং ঢাকাস্থ গাইবান্ধাবাসী।

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad