Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ৩ ঘন্টা আগে
  • ৭ বার দেখা হয়েছে

নদ-নদীর পানিতে বিষাক্ত ধাতুর দূষণ বাড়ছে

নদ-নদীর পানিতে বিষাক্ত ধাতুর দূষণ বাড়ছে

অনলাইন ডেস্ক  ►

দেশের নদ-নদীর পানিতে বিষাক্ত ভারী ধাতুর দূষণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। একসময় রাজধানী ঢাকার আশপাশের নদীগুলোতেই এ দূষণ সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু এখন উপকূলীয় নদী ও মোহনায়ও তা ছড়িয়ে পড়েছে। এতে মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে আজ ১৪ মার্চ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নদীকৃত্য শব্দের অর্থ নদী রক্ষায় করণীয়। ১৯৯৭ সালের মার্চে ব্রাজিলের কুরিতিবা শহরে পরিবেশবাদীদের একটি আন্তর্জাতিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিভিন্ন দেশের পরিবেশকর্মীরা নিজ নিজ দেশের নদ-নদীর করুণ অবস্থা তুলে ধরে সেগুলো রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ওই সমাবেশ থেকেই প্রতিবছর ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়।

মূলত নদীর প্রতি মানুষের করণীয় কী এবং নদী রক্ষায় মানুষের দায় ও দায়িত্ব কতটুকু-এসব বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে দিবসটি পালন করা হয় বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে নদ-নদী সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং নদী ভাবনা জাগিয়ে তুলতে একটি বেসরকারি সংগঠন প্রথম ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস পালন করে। এর পর থেকে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন নদ-নদী রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে দিবসটি পালন করে আসছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, নদীকৃত্য দিবস সামনে রেখে নদ-নদীতে ধাতুর দূষণের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আশরাফুল আজম খান এবং গবেষণা সহকারী কাজী নুসরাত জাহান ঐশীর যৌথ গবেষণায় উদ্বেগজনক ফলাফল পাওয়া গেছে। গবেষণাটি মাতামুহুরী নদী, বাঁকখালী নদী, মহেশখালী চ্যানেল, নাফ নদী, সেন্ট মার্টিন দ্বীপসহ গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় পরিচালিত হয়েছে। আধুনিক আইসিপি-এমএস প্রযুক্তি (আধুনিক ল্যাব টেকনোলজি) ব্যবহার করে নদী ও মোহনার পলিতে জমে থাকা ক্যাডমিয়াম, কপার, ক্রোমিয়াম, নিকেল, সিসাসহ বিভিন্ন ভারী ধাতুর মাত্রা নির্ণয় করা হয়।

আন্তর্জাতিক জার্নাল সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্টে (এলসেভিয়ার) প্রকাশিত ওই গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাঁকখালি নদী ও মহেশখালী চ্যানেল উপকূলীয় দূষণের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। এই দুই স্থানে পিএলআই মান ২-এর বেশি, যা উচ্চ মাত্রার দূষণের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষত সবচেয়ে উদ্বেগজনক ধাতু হিসেবে শনাক্ত হয়েছে ক্যাডমিয়াম। এর উচ্চ বিষক্রিয়ার কারণে পিইআর মান বাঁকখালিতে ৩৩১.৯১ শতাংশ এবং মহেশখালীতে ২৯৫.৪৩ শতাংশ, যা ‘অত্যন্ত উচ্চ পরিবেশগত ঝুঁকি’ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। ওই দূষণের মূল কারণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে, শিল্প-কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, নগর পয়োনিষ্কাশন থেকে নিঃসৃত পানি, জাহাজ ভাঙা কার্যক্রম, বন্দরভিত্তিক নৌচলাচল এবং কৃষি ও নগর এলাকা থেকে বয়ে আসা দূষিত নদী নিষ্কাশন। চট্টগ্রাম ও মহেশখালী অঞ্চলে এসব কার্যক্রমের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় সেখানে দূষণের চাপও বেশি। এই ধাতুদূষণের সরাসরি প্রভাব পড়ছে মৎস্যসম্পদের ওপর। 

পলিতে জমে থাকা ধাতু ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী ও প্লাংকটনের শরীরে প্রবেশ করে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মাছ ও চিংড়িতে চলে আসে। ফলে মাছের প্রজনন ও বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সংখ্যা কমতে থাকে। এতে একদিকে জেলেদের আয় কমছে, অন্যদিকে দূষিত মাছ মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের কারণে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে।

এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকোয়াকালচার বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, দূষণ উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ম্যানগ্রোভ বন, নদী-মোহনার তলদেশের জীববৈচিত্র্য এবং সামুদ্রিক খাদ্যচক্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেরি হলে কিছু অঞ্চলে ইকোসিস্টেমে অস্থিতিশীলতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে মৎস্যসম্পদের পতন ঘটতে পারে, যা উপকূলীয় অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

মীর মোহাম্মদ আলী আরো বলেন, “দেশে দেশে এখন নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। আমাদের উচ্চ আদালতের রায়েও একই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অথচ আমরা উল্টো পথে হাঁটছি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষায় নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে জীবন-জীবিকা ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।’

এদিকে দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বুড়িগঙ্গা নদীর প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে বছিলা ঘাট থেকে হাইক্কার খাল পর্যন্ত গণ-পদযাত্রার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। আজ শনিবার সকাল ১১টায় বছিলা পুরাতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীর পারে (বছিলা ব্রিজের নিচে) সংক্ষিপ্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে গণ-পদযাত্রা শুরু হবে।

কর্মসূচি আয়োজনে রয়েছে ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), বারসিক, ব্রাইটার্স, নদী পরিব্রাজক দল, বুড়িগঙ্গা রিভারকিপার, ক্লাইমেট ফ্রন্টায়ার, এনভায়রনমেন্ট রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট আল্টারনেটিভ, ওএবি ফাউন্ডেশন, রিভার বাংলা, অর্গানাইজেশন ফর ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট কনজারভেশন, গর্জন সমাজকল্যাণ সংস্থা, গ্লোবাল ল থিংকার্স সোসাইটি, রিভারাইন পিপল, সচেতন ফাউন্ডেশন, ইয়ং ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ, ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন এবং ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ।

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad