
অনলাইন ডেস্ক ►
জ্বালানি সংকটের কারণে কৃষকদের সেচ কার্যক্রম যেখানে ব্যহত হচ্ছে, সেখাসে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের একজন স্কুলশিক্ষক ও কৃষি উদ্যোক্তা ডিজেলের বিকল্প জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করছেন পোড়া মোবিল।
সাথে তার নিজস্ব ফর্মুলায় তৈরি একটি ‘বুস্টার’ নামক কেমিক্যাল। ৫ লিটার পোড়া মোবিলের সাথে ১০০ মিলিলিটার মিশিয়ে ডিজেলের চেয়ে বেশিক্ষণ সেচ পাম্প চালাচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি। তার এ বুস্টার ‘ম্যাথড অব অল্টারনেটিভ ডিজেল (এমএডি)’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
যা তিনি ডিজেলের বিকল্প বলে দাবি করছেন। দীর্ঘদিন পরীক্ষার পর মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের মাঝে বিক্রি করছেন এই বুস্টার। ডিজেলের চেয়ে খরচ কম এবং ডিজেল সংকটে এটি বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে বলে জানান স্থানীয় কৃষকরা। তবে, মেশিনারি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পরীক্ষা না করে স্পষ্ট হওয়া যাবে না যে এই পদ্ধতিতে ব্যবহৃত কেমিক্যাল কতটা ঝুঁকিমুক্ত।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর চর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ডিজেলচালিত স্যালো ইঞ্জিনে জ্বালানি হিসাবে ডিজেলের পরিবর্তে পোড়া মোবিল ও বুস্টার দিয়ে মেশিন চালু করে সেচ দেওয়া শুরু হয়েছে। বর্তমানে ওই চরের প্রায় ৩০-৪০টি স্যালো ইঞ্জিনে এ জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে।
দৌলতপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে একই চিত্র দেখা যায়। বেশিরভাগ কৃষক এ বিকল্প জ্বালানিতে সেচপাম্প চালু করার জন্য মনির হোসেনের সাথে যোগাযোগ করছেন। মনির হোসেনও তাদের সহযোগিতা করছেন।
বুস্টারের উদ্ভাবক হিসাবে দাবি করা কৃষি উদ্যোক্তা মনির হোসেন বলেন, ‘২০০৭ সাল থেকে আমি শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষকদের কথা চিন্তা করে ডিজেল ইঞ্জিনের বিকল্প জ্বালানি ইঞ্জিন নিয়ে কাজ শুরু করি।
দীর্ঘদিন আমি ডিজেল ইঞ্জিন নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাই। এমন একটা সময় আসে যে, আমাকে যে কোন একটিকে বেছে নিতে হচ্ছে। আমি শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে শুধুমাত্র এই গবেষণায় মনোনিবেশ করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০১৯ সালে করোনা শুরু হওয়ার কয়েকদিন পূর্বে চায়নাতে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি ডিজেল ইঞ্জিনের বিভিন্ন ফাংশন, ফুয়েল সিস্টেম এবং সাকসন ও কমপ্রেসার নিয়ে কর্মশালায় যোগদান করি। সেই সাথে ওই দেশের ডিজেল ইঞ্জিনের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে যাই। সেখানে ডিজেল ইঞ্জিন নিয়ে কাজ করি তাদের সাথে। সেখান থেকেই আমার মাথায় আসে এই সূত্রটি।
পরে দেশে এসে আমি ডিজেলের বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে কীভাবে ডিজেল ইঞ্জিন চালানো যায় এই নিয়ে বিস্তর গবেষণা শুরু করি। আমি প্রাথমিকভাবে ৪-৫টা মৌলিক উপাদান দিয়ে একটা যৌগ তৈরি করি। যখন সেটা ব্যবহার করি তখন ইঞ্জিনে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। তারপরেও আমি হাল ছেড়ে দেইনি। গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলাম নিজের মতো করেই’।
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি যখন সারাদেশে ডিজেলের সংকট দেখা দিলো, দেখলাম কৃষকরা কতটা কষ্ট করছে। তখন মনে হলো যে, ডিজেলের বিকল্প কিছু করতেই হবে। পরবর্তীতে আরও কিছু উপাদান যোগ করে ৮০ ভাগ সফলতা পাই। সর্বশেষ এক মাস আগে আমি মোট ১২টি উপাদান যোগ করে শতভাগ সফলতা পাই। আমি বেশ কয়েকটা ইঞ্জিনে পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছি।
বর্তমানে প্রায় ৫০-৬০ জন কৃষক সেচ, মাড়াই, স্যালো ইঞ্জিন চালাতে আমার এই বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে। এর মাধ্যমে ডিজেল ছাড়াই ডিজেল ইঞ্জিন চলছে। কৃষকদের খরচ কম হচ্ছে।
তিনি বলেন, এটি ব্যবহারের ফলে এই উপজেলায় প্রতিদিন ৫-৭ হাজার টাকার ডিজেল সাশ্রয় হচ্ছে কৃষকদের। সেই সাথে কৃষকরাও বেশ খুশি। দৌলতপুর উপজেলার মানিকদিয়াড় কৃষক আবু বক্কর বলেন, ‘ডিজেলের পরিবর্তে পোড়া মোবিল ব্যবহার করলে আমাদের সাশ্রয় হবে। ডিজেলের বিকল্প হলে আমরা কৃষকরা উপকৃত হবো।’
একই এলাকার কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এলাকায় ডিজেলচালিত স্যালো সেচপাম্প এবং বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পই কৃষিকাজের জন্য প্রধান সেচের উৎস। ডিজেলের বিকল্প জ্বালানি পেলে চাষিদের জন্য সুবিধা হবে। মনিরুল ইসলামের এই বুস্টার দিয়ে মেশিন চালালে সেচ খরচও কম হবে’।
দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রেহেনা পারভীন বলেন, ‘আমরা কৃষকদের সেচ কাজে পানি সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনার ওপরে জোর দিয়েছি। কৃষকদের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করছি। কিছু কৃষক ডিজেলের পরিবর্তে পোড়া মোবিল দিয়ে স্যালো ইঞ্জিনে সেচ দিচ্ছে শুনেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে’।
কৃষিজমিতে সেচ এবং ডিজেল ইঞ্জিনে কৃষকদের বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার সম্পর্কে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. শওকত হোসেন ভুইঁয়া।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কেন্দ্র গাজীপুরের ফার্ম মেশিনারি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নুরুল আমিন জানান, ডিজেল চালিত স্যালো ইঞ্জিনে অন্য কোন জ্বালানি দিয়ে চলার কথা না। কিন্তু দৌলতপুর এলাকার ওইসব কৃষক কীভাবে চালাচ্ছেন পোড়া মোবিল দিয়ে সেটা খতিয়ে দেখতে হবে।
পোড়া মোবিলের সাথে কী ধরনের কেমিক্যাল তারা ব্যবহার করছে এবং এটা বিপদজনক কিনা তা পরীক্ষা করে বলা যাবে।
আমরা ওই কৃষকদের সাথে যোগাযোগ করেছি।