
অনলাইন ডেস্ক ►
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে নতুন সূর্যোদয় হতে চলেছে। পনেরো বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যের মসনদে বসতে চলেছেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) হেভিওয়েট নেতা শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার দলের নবনির্বাচিত বিধায়কদের বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে তাকে বিধানসভার পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচিত করা হয়েছে। এর ফলে জল্পনার অবসান ঘটিয়ে শুভেন্দুই হচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী।
শুক্রবার বিকেলে কলকাতার নিউ টাউনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে বিজেপির ২০৭ জন নবনির্বাচিত বিধায়কদের নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি। বৈঠক শেষে অমিত শাহ আনুষ্ঠানিকভাবে শুভেন্দু অধিকারীকে পরিষদীয় দলনেতা ও হবু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেন। শাহ জানান, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আটটি পৃথক প্রস্তাব এলেও প্রতিটি প্রস্তাবেই শুভেন্দু অধিকারীর নাম উঠে এসেছে। কোনো দ্বিতীয় নাম না আসায় সর্বসম্মতিক্রমে তাকেই এই পদের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে।
আজ শনিবার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হবে। রাজভবনের বাইরে জনগণের সামনে এই শপথ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শুভেন্দু অধিকারীর সাথে মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন সদস্যও আগামীকাল শপথ নিতে পারেন।
২০২৬ সালের এই নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারী এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। তিনি একই সাথে নিজের পুরোনো কেন্দ্র নন্দীগ্রাম এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের খাসতালুক বলে পরিচিত ভবানীপুর-উভয় আসনেই জয়ী হয়েছেন। বিশেষ করে ভবানীপুরে তৃণমূল নেত্রীকে ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত করা শুভেন্দুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে ২০২১ সালের নির্বাচনেও তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নন্দীগ্রামে পরাজিত করেছিলেন।
রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোতে এবার নতুনত্ব আনতে পারে বিজেপি। গত দুই দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে কোনো উপ-মুখ্যমন্ত্রী না থাকলেও, এবার দুজন উপ-মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। আসানসোল দক্ষিণ থেকে জয়ী নারী নেত্রী অগ্নিমিত্রা পলকে রাজ্যের প্রথম নারী উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ভাবা হচ্ছে। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় শিলিগুড়ির বিধায়ক শঙ্কর ঘোষের নামও উপ-মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছে।
২৯৪ আসন বিশিষ্ট পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৩টি আসনের ফলাফল ঘোষিত হয়েছে। এতে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিজেপি। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস থমকে গেছে মাত্র ৮০টি আসনে। বাম, কংগ্রেস ও অন্যান্য ছোট দলগুলো সম্মিলিতভাবে ৬টি আসন পেয়েছে। বাকি একটি আসনে (ফলতা) আগামী ২১ মে পুনর্নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
শুভেন্দু অধিকারী একসময় তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। ২০২০ সালের শেষের দিকে তিনি তৃণমূল ত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দেন। গত পাঁচ বছর বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে তিনি শাসক দলের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। অনুপ্রবেশ, দুর্নীতি এবং বেকারত্বের মতো ইস্যুগুলোকে সামনে রেখে তিনি রাজ্যে বিজেপির জনভিত্তি শক্ত করতে সক্ষম হন। আরএসএস-এর সাথে সরাসরি পুরনো সম্পর্ক না থাকলেও, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনপ্রিয়তার কারণেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তার ওপর আস্থা রেখেছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে এই নতুন সরকার রাজ্যের উন্নয়ন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। এখন সকলের নজর আগামীকালের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের দিকে।