
এ মান্নান আকন্দ, সুন্দরগঞ্জ ►
বেলকা নবাবগঞ্জ ফকিড়পাড়া চরের মোহাম্মদ বাক্কা দেওয়ানী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে হাসপাতালে নেওয়ার মত ছিল না কোনো যানবাহন। অবশেষে পরিবারের লোকজন তাকে কাঠের তকতার মধ্যে শোয়ায়ে রশি দিয়ে ভার সাজিয়ে কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ায় এলাকায় ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকে চিকিৎসা সেবার এই সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তন জন্য জোর দাবি জানিয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে গত শনিবার বিকালে।
বাক্কা মিয়ার পরিবারের লোকজন বলেন, তাদের বাড়ি থেকে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দুরত্ব প্রায় ১০ কিলামিটার। বৃষ্টি-বাদলের কারণে চরের মধ্যে পানি জমে গেছে। পানি কম হওয়ায় চলে না নৌকা। নেই কোনো রাস্তাঘাট। রিস্কা, ভ্যান চলাচলের নেই কোনো বালাই। চরের একমাত্র বাহন গোড়ার গাড়ি। চরে পানির উঠার কারণে গোড়ার গাড়িও চলে না। শেষে বাধ্য হয়ে পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশিরা মিলে রশি দিয়ে ভার সাজিয়ে তাকে উপজেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে গতকাল রোববার তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, চরের মানুষের জীবন যাত্রার গুনগত মানের আজও কোনো পরিবর্তন হয়নি। চরের মানুষ যেন শহরের মানুষ থেকে আলাদা এক জগতে বাস করছেন। চরের মানুষের নানাবিধ ঘটনা এখনো সচেতন ও মানবিক মানুষকে নাড়া দেয়। মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রায় সবগুলো সূচক হতে আজও চরের মানুষ অনেকটা বঞ্চিত। বিশেষ করে এখনো সেই সনাতন পদ্ধতিতে চলছে চরের মানুষের চিকিৎসাসেবা। ফকিড়ের পানি পড়া, তেল পড়া, কবিরাজি দিয়ে চলছে বেশির ভাগ চিকিৎসা। কোনো দূর্ঘটনা বা জটিল কঠিন রোগে চরবাসি আক্রান্ত হলে, তাদেরকে হাসপাতালে নেওয়ার মত দ্রুত গতির কোনো যানবাহন নেই। কারণ একটায় নেই কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা। এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। বর্ষাকালে এবং গ্রীষ্মকালে এ ধরণের ঘটনা অহরহ ঘটেই থাকে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, উপজেলা শহর থেকে একটি রাস্তা পঞ্চনন্দ দাখিল মাদ্রাসা হয়ে শ্যামরায়ের পাঠ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত এসেছে। কিন্তু ইতোমধ্যে বৃষ্টি-বাদলের কারণে অসংখ্য খানা-খন্দে ভরে গেছে। রিস্কা, ভ্যান তো দূরের কথা সাধারণ মানুষ পায়ে হেঁটে চলাচল করতেও কষ্ট হচ্ছে। সীমাহীন কষ্ট নিয়ে চরের মানুষের জীবন চলা। বিশেষ করে অসুস্থ রোগীদের নিয়ে অনেক কষ্টে থাকেন চরের মানুষ। উজানের পলিজমে চর ভরে উঠায় নৌকা চলাচল বন্ধ রয়েছে। তাই পায়ে হেঁটে বা গোড়ার গাড়িতে করে চলাচল করতে হয়।
শ্যামরায়ের পাঠ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার নাজুক পরিস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে চায় না। এমনকি যথা সময়ে স্কুলে উপস্থিত হওয়াও অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে যায়। প্রতিনিয়ত পায়ে হেঁটে স্কুলে আসতে হয়। চরের জীবন মানের কোনো পরিবর্তন আজও হয়নি।
বেলকা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহিম খলিলুল্ল্যাহ বলেন, প্রতিবছর চরের রাস্তাঘাট মেরামত করতে হয়। তা না হলে চলাচল করা অত্যন্ত দূরহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে চিকিৎসা সেবায় সীমাহীন কষ্ট করতে হয় চরবাসিকে।
উপজেলা ছয়টি ইউনিয়নের ওপর প্রবাহিত তিস্তার প্রায় ৩০টি চরবাসির একই পরিনতি। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মশিয়ার রহমান বলেন, চরের রাস্তাঘাট প্রতিবছর মেরামত করতে হয়। দূর্গম চরে যানবাহন চলাচল অত্যন্ত কষ্টকর। স্থায়ীভাবে ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত চরের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার দিবাকর বসাক বলেন, চরে রাস্তাঘাট না থাকার কারণে অ্যাম্বুলেন্স যাওয়া সম্ভব নয়। বিকল্প ব্যবস্থা করে জটিল কঠিন রোগীদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসতে হয়।