
সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর ►
দিনাজপুর চিরিরবন্দরের বিভিন্ন গ্রামে পরিবেশবান্ধব ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন নারী ও তরুণ উদ্যোক্তারা। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা কাজে লাগিয়ে তারা এখন সফল উদ্যোক্তায় পরিণত হয়েছেন। একই সঙ্গে রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এই জৈব সার।
সম্প্রতি উপজেলার আউলিয়াপুকুর ইউনিয়নের মোহাদানী গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, অনেক নারী ও তরুণ নিজেদের বাড়িতেই কেঁচো সার উৎপাদন করে পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন। তাদের এই উদ্যোগ শুধু পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটায়নি, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মোহাদানী গ্রামের উদ্যোক্তা স্মৃতি রায় জানান, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ১২ দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর মাত্র দুটি চাড়ি দিয়ে তিনি কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করেন। বর্তমানে তার ১৬টি চাড়িতে নিয়মিত সার উৎপাদন হচ্ছে। উৎপাদিত সার স্থানীয় কৃষকদের কাছে বিক্রি করে তিনি ভালো আয় করছেন। তিনি বলেন, “কেঁচো সার বিক্রি করে যে আয় হয়, তা দিয়ে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছি। পরিবারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তেও এখন আমার মতামত গুরুত্ব পায়। এই কাজ আমাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
একই গ্রামের নারী উদ্যোক্তা মায়া রাণী ও রূপালী রায় এবং তরুণ উদ্যোক্তা মো. রাশেদ আলী জানান, তারা ১২টি রিং ও পাঁচটি হাউজে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করছেন। প্রতি মাসে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হচ্ছে। ফলে পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা এসেছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
রাশেদ আলী বলেন, “প্রশিক্ষণের পাশাপাশি উৎপাদিত সার বাজারজাত করার ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয়েছে। ফলে আমরা এখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছি এবং স্বাবলম্বী হয়েছি। স্থানীয় কৃষক আব্দুল করিম বলেন, “আগে জমিতে রাসায়নিক সার বেশি ব্যবহার করতাম। এখন কেঁচো সার ব্যবহারের ফলে ভালো ফলন পাচ্ছি। মাটির উর্বরতাও বেড়েছে। তাই প্রতিবছরই এই সার ব্যবহার করছি।
আরেক কৃষক নিতাই চন্দ্র রায় বলেন, “ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারের পর ধান ও সবজির উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। উৎপাদন খরচও কমেছে। এজন্য অনেক কৃষক এখন জৈব সারের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। মোহাদানী গ্রামের বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, “আগে গ্রামের অনেক নারী ঘরের কাজেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। এখন তারা কেঁচো সার উৎপাদনের মাধ্যমে নিজেরা আয় করছেন। এতে পরিবার ও সমাজে তাদের মর্যাদা বেড়েছে। স্থানীয় গ্রামবাসী আবুল হোসেনের মতে, এই উদ্যোগ গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়ায় পুরো এলাকায় উন্নয়নের নতুন ধারা সৃষ্টি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আফজাল হোসেন বলেন, বর্তমান সময়ে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় জৈব সারের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। ভার্মি কম্পোস্ট মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে, ফসলের উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। নিরাপদ শাকসবজি, ফলমূল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনে কেঁচো সারের বিকল্প নেই। তাই কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারে আরও বেশি উৎসাহিত করা হচ্ছে।