Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ৩ ঘন্টা আগে
  • ৫ বার দেখা হয়েছে
ফটো কার্ড

টিকলির মাঠে সবুজ ঘাসে বদলাচ্ছে খামারিদের ভাগ্য

টিকলির মাঠে সবুজ ঘাসে বদলাচ্ছে খামারিদের ভাগ্য

সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর ►

বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে শুধু সবুজ আর সবুজ। যতদূর চোখ যায়, ততদূরই সবুজ ঘাসের সমারোহ। কোথাও গরুর পাল, কোথাও ছাগলের দল। সকাল হলেই আশপাশের কয়েকটি গ্রামের ছোট ছোট খামারিরা গরু-ছাগল নিয়ে ছুটে আসেন এই মাঠে। সারাদিন ঘাস খেয়ে বিকেল কিংবা সন্ধ্যার আগে আবার দলবেঁধে বাড়ি ফেরে পশুগুলো। এভাবেই বছরের পর বছর প্রাকৃতিক ঘাসের ওপর নির্ভর করে গরু পালন করে নিজেদের ভাগ্যের চাকা ঘোরাচ্ছেন দিনাজপুরের সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের মহব্বতপুর, উলিপুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ। 

স্থানীয়দের কাছে মাঠটির নাম ‘টিকলির মাঠ’। পুনর্ভবা নদীর তীরবর্তী এই বিশাল মাঠ এখন শুধু চারণভূমি নয়, বরং আশপাশের কয়েকটি গ্রামের ছোট ও প্রান্তিক খামারিদের জীবিকার অন্যতম অবলম্বন হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন সকাল হলেই শুরু হয় ব্যস্ততা। খামারিরা গরুর পাল নিয়ে মাঠে আসেন। কেউ গরুগুলোকে ছেড়ে দেন মুক্তভাবে, আবার কেউ লম্বা রশি দিয়ে বেঁধে নির্দিষ্ট জায়গায় ঘাস খাওয়ান। মাঠের বিভিন্ন স্থানে থাকা ছোট ছোট পুকুর থেকে গরুকে পানি পান করানো হয়। অনেকেই গরুকে পুকুরে গোসলও করিয়ে নেন। মাঠে থাকা কয়েকটি গাছের নিচে রয়েছে পশুদের সাময়িক বিশ্রামের জায়গাও। 

সারাদিন মাঠের প্রাকৃতিক ঘাস খাওয়ার পর বিকেল থেকে সন্ধ্যার আগেই আবার শুরু হয় বাড়ি ফেরার পালা। খামারিরা গরুর পাল নিয়ে একে একে বাড়ির পথে রওনা দেন। বাড়িতে সামান্য খড় বা প্রয়োজনীয় খাবার দিয়ে রাতে রাখার পর পরদিন সকালেই আবার নিয়ে আসেন টিকলির মাঠে। 

স্থানীয় খামারিদের ভাষ্য, এই মাঠের কারণে গরু পালনের খরচ অনেকটাই কমে গেছে। বাজার থেকে নিয়মিত দানাদার খাবার কিনতে হয় না। ফলে কম পুঁজি নিয়ে গরু পালন করেও লাভের মুখ দেখছেন তারা। খামারিরা জানান, গরু পালনের সবচেয়ে বড় ব্যয় খাবার। কিন্তু টিকলির মাঠে সারা বছর প্রাকৃতিক ঘাস পাওয়া যাওয়ায় তাদের সেই ব্যয় অনেকটাই কমে গেছে। ফলে অল্প পুঁজি দিয়ে গরু পালন করে ধীরে ধীরে খামারের সংখ্যা বাড়াচ্ছেন অনেকে। কেউ দুধ বিক্রি করছেন, কেউ গরু মোটাতাজা করে বিক্রি করছেন। আবার কেউ গরু বিক্রির অর্থ দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা, ঘরবাড়ির উন্নয়নসহ পরিবারের নানা প্রয়োজন মেটাচ্ছেন। উলিপুর গ্রামের খামারি রেজাউল করিমের রয়েছে ১৫টি গরু। 

তিনি বলেন, বছরের প্রায় পুরোটা সময় টিকলির মাঠে গরু চরান তিনি। রেজাউল করিম বলেন, “আমার ১৫টি গরু রয়েছে। প্রতিবছর এই মাঠের ঘাস খেয়েই গরুগুলো মোটাতাজা হয়। গরু দুধও দেয়। প্রতি বছর দুই থেকে তিনটি গরু বিক্রি করি। এতে বছরে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা আয় হয়। এই আয় দিয়েই পরিবারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালাই। আমাদের মতো ছোট খামারিদের জন্য এই মাঠ সত্যিই আশীর্বাদ। একই এলাকার খামারি হযরত আলীর রয়েছে নয়টি গরু। প্রতিদিন সকালে গরুগুলো মাঠে ছেড়ে দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী দেখাশোনা করেন তিনি। 
হযরত আলী বলেন, আমার নয়টি গরু আছে। সারাদিন মাঠে ছেড়ে রাখি। গরুগুলো নিজেরাই ঘুরে ঘুরে ঘাস খায়। দুপুরের দিকে একবার এসে দেখে যাই। আবার বিকেল কিংবা সন্ধ্যার আগে গরুগুলোকে নিয়ে বাড়ি ফিরি। মাঠের ঘাস খেয়ে গরুর স্বাস্থ্য ভালো হচ্ছে, দুধও বেশি দিচ্ছে। এখান থেকে আমারও ভালো আয় হচ্ছে। 

মহব্বতপুর এলাকার খামারি হাসেম আলী বলেন, “আমাদের জন্য এই মাঠ আশীর্বাদের মতো। সারা বছর এখানে ঘাস পাওয়া যায়। এই ঘাস খেয়েই গরু মোটাতাজা হয়। আমার মতো অনেক ছোট খামারি কয়েকটি করে গরু পালন করছেন। বাজার থেকে বেশি দামে দানাদার খাবার কিনতে হয় না। এতে আমাদের খরচ কমে যায়, আবার গরুর স্বাস্থ্যও ভালো থাকে। 

আরেক ছোট খামারি সাইফুল ইসলাম বলেন, আমার কয়েকটি গরু রয়েছে। আগে গরুর খাবার কিনতে গিয়ে অনেক টাকা খরচ হতো। এখন মাঠে ঘাস থাকায় সকালে গরু নিয়ে আসি, সারাদিন ঘাস খেয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি নিয়ে যাই। এতে গরুর খাবারের খরচ অনেক কমেছে। গরু মোটাতাজা হলে বিক্রি করে ভালো দাম পাওয়া যায়। এই মাঠ না থাকলে আমাদের মতো ছোট খামারিদের জন্য গরু পালন করা অনেক কঠিন হয়ে যেত। 

মহব্বতপুরের আরেক খামারি আবদুল জলিল বলেন, এখানে শুধু বড় খামারি নয়, আমাদের মতো ছোট খামারিরাও সুবিধা পাচ্ছে। কয়েকটি গরু দিয়ে শুরু করেছি। মাঠে ঘাস থাকায় বাড়তি খাবারের চাপ কম। গরু ভালো থাকলে দুধ বিক্রি করে প্রতিদিনের সংসার খরচ চলে, আবার প্রয়োজন হলে গরু বিক্রি করে বড় অঙ্কের টাকাও পাওয়া যায়। তাই এই মাঠ আমাদের জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। 

দিনাজপুর প্রাণিসম্পদ হাসপাতালের মেডিকেল কর্মকর্তা ডাঃ আশিকা আকবর তৃষা বলেন, প্রাকৃতিক পরিবেশে মাঠের ঘাস খেয়ে গরু পালন করলে পশুর স্বাস্থ্য ভালো থাকে। খোলা মাঠে বিচরণ, পর্যাপ্ত সূর্যের আলো ও বাতাস পশুর স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। প্রাকৃতিক পরিবেশে গরু পালন অনেক ক্ষেত্রেই বদ্ধ খামারের তুলনায় ভালো। তবে পশুর স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে নিয়মিত টিকা, কৃমিনাশক ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে। 

দিনাজপুর প্রেসক্লাবের আহবায়ক এ এইচ বাবলু বলেন, দিনাজপুর সদরের টিকলির মাঠের মতো প্রাকৃতিক চারণভূমিগুলো সংরক্ষণ করা গেলে ছোট খামারিদের গরু পালন আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে মাঠের পুকুর ও সবুজ ঘাসের পরিবেশ রক্ষা করা গেলে ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষ গবাদিপশু পালনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারবেন। সবুজ ঘাসে ঢাকা টিকলির মাঠ তাই এখন শুধু একটি বিস্তীর্ণ চারণভূমি নয়-এটি আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক সম্ভাবনার নাম। ভোরে গরুর পাল নিয়ে মাঠে আসা আর সন্ধ্যায় গরুর পাল নিয়ে বাড়ি ফেরার এই দৃশ্যের আড়ালেই যেন বদলে যাচ্ছে বহু ছোট খামারির জীবনের গল্প।

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad