
উজ্জল চক্রবর্ত্তী ►
বাংলাদেশে যে ক জন সাংবাদিক আধুনিকতাকে স্পর্শ করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম গোলাম সারওয়ার। অর্থাৎ আধুনিক পত্রিকা জগতের সাংবাদিকতার পথিকৃৎ হিসেবে খ্যাত তিনি। ধারাবাহিকভাবে দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সমকালের মত পত্রিকা তাঁর বলিষ্ঠ হাতের স্পর্শ পেয়েছে। এরমধ্যে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় দীর্ঘদিন বার্তা সম্পাদক এবং পরবর্তীতে দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক সমকাল পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওইসব পত্রিকাই আজ বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা। তাঁর মেধা মনন ও শ্রমে ওইসব পত্রিকা পত্রিকার জগতে সমুজ্জল। এছাড়া তাঁর স্নেহশীল সংস্পর্শে এসেই প্রথিতযশা হয়েছেন হাজারও সাংবাদিক। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র বলা হতো তাঁকে।
তাঁর স্নেহধন্য সংস্পর্শে এসে কাজ করার সুযোগ হয়েছিলো আমার। সে ২০০৯সালের কথা। আমি তখন উল্লেখযোগ্য কোন পত্রিকায় কাজ করতাম না। সমকালের গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধির পদে ছিলেন দাদা অমিতাভ দাশ হিমুন। তিনি পত্রিকাটি ছেড়ে অন্য পত্রিকায় চলে গেলে পদটি শূন্য হয়ে যায়। তখন অন্য ডজনখানেক সাংবাদিকের মধ্যে আমারও একটি জীবনবৃত্তান্ত জমা দেই সমকাল অফিসে। ১০-১২জন নিয়মিত নিউজ পাঠালেও সমকালের পাতায় ছাপা হতো আমার পাঠানো সংবাদগুলো। প্রায় ৬মাস পর সাক্ষাৎকারের জন্য ডাক আসে আমার। সমকাল অফিসে গিয়ে দেখি পত্রিকার অন্য জেলার প্রতিনিধি জন্য সাক্ষাৎকার দিতে এসেছেন আরও কয়েকজন। আমি তাদের সাথে বসলাম ওয়েটিং রুমে। সেখান থেকে একে একে ডাকা হলো পত্রিকার সম্পাদক গোলাম সারওয়ার এঁর কক্ষে। প্রবীণ প্রথিতযশা সাংবাদিকের সামনে বসে একা একা সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে প্রায় সকলেরই গলা শুকিয়ে যাচ্ছিলো। হাত-পা কাঁপছিলো। আমারও প্রায় একই অবস্থা। তবে প্রথিতযশা একজন সাংবাদিকের মুখোমুখি হবো এই ভেবে আনন্দও কাজ করছিলো মনে। যাইহোক প্রায় ১৫ মিনিটের সাক্ষাৎকার। সম্পাদকের পাশেই ছিলেন পত্রিকার জিএম ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) সাহাব উদ্দিন, নির্বাহী সম্পাদক টিভি আলোচক আবু সাঈদ খান, বার্তা সম্পাদক সিদ্দিক হোসেন, মফস্বল বার্তা সম্পাদক চিত্ত কর প্রমুখ।
এখন কোন পত্রিকায় কাজ করা হয়, সম্পাদকের এমন প্রশ্নের জবাবে জানাই ‘নিউজ নেটওয়ার্ক অব বাংলাদেশ (এনএনবি)তে জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। এছাড়া দৈনিক দেশজনতা, দৈনিক শ্যামবাজার, দৈনিক উত্তরা, দৈনিক উত্তরাঞ্চল, দৈনিক সোনার দেশ, দি ইভিনিং নিউজ ইত্যাদি ইত্যাদি পত্রিকায় কাজ করেছি এবং করছি। আরও বলি স্থানীয় একটি পত্রিকা ‘দৈনিক মাধুকর’ এ বার্তা সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। সম্পাদক চোখ খুলে তাকালেন নেগেটিভসূচক মাথা নাড়লেন এবং বললেন, ভালো কোনো পত্রিকার নাম বলো। এগুলোতো উল্লেখযোগ্য কোন পত্রিকা না। আমি বললাম স্যার, আমি এগুলোতেই কাজ করেছি। তিনি বললেন, দু-একটি প্রতিবেদন দেখাও। আমি বেশকয়েকটি প্রতিবেদন দেখালাম। এছাড়া সাংবাদিকতা ও ব্যক্তিগত অন্যান্য অনেক প্রশ্ন করলেন। আমি যথাযথ উত্তর দিলাম। বেশ অবলিলায় সঠিক উত্তরগুলো দিতে পেরেছি। পরে বললেন, যাওয়ার সময় নিয়োগপত্র নিয়ে যেয়ো। কাজ ভালোভাবে করবে।
তারপরও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন লেখা নিয়ে একাধিকবার টেলিফোনে দীর্ঘসময় পরামর্শ দিয়েছেন সম্পাদক, বার্তা সম্পাদকসহ ডেস্ক ইনচার্জরা। তবে সম্পাদক সাহেব দুই-তিন মাসে পত্রিকার সার্কুলেশন, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার জন্য ফোন করলেও নিউজ নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন বহুবার। প্রতিনিধি সম্মেলনে তিনি সমকালের সাংবাদিকদের অনেক পরামর্শ দিতেন স্নেহ সুলভ ভাষায়। বয়সে প্রবীণ হলেও সর্বশেষ প্রতিনিধি সম্মেলনে তিনি সকলের আনন্দের জন্য ‘জলের গানের’ ঘোষণা দেন এবং নিজেও সকল জেলা, উপজেলা প্রতিনিধিদের সাথে বসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পুরোটাই উপভোগ করেন।
গোলাম সারওয়ার ১৯৪৩ সালের ১ এপ্রিল বরিশাল জেলার বানারীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা গোলাম কুদ্দুস মোল্লা এবং মা সিতারা বেগম। তিনি ছিলেন পরিবারের সব ভাইবোনের মধ্যে বড়। ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিলো। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই তিনি ১৯৬২সালে সাংবাদিকতায় প্রবেশ করেন। তিনি সেসময় দৈনিক আজাদী পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা ছিলেন। পাশাপাশি তিনি দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সেসময় তাঁর সংবাদ লেখার ধরণ, কৌশল, সম্পাদনা ও ভাষাজ্ঞান তাকে সাংবাদিকতার জগতে বিশেষ আসনে অধিষ্ঠিত করে। সংবাদে থাকাকালে তিনি ১৯৭১সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। পরে কিছুদিন তিনি নিজের এলাকার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি ১৯৭২সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় সিনিয়র সহ-সম্পাদক পদে যোগ দেন। সেখানে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখায় প্রধান সহ-সম্পাদক, যুগ্ম বার্তা সম্পাদক এবং বার্তা সম্পাদক হিসেবে পদোন্নতি পান এবং যথাযথ নিষ্ঠারসাথে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন। সংবাদ নির্বাচন, শিরোনাম তৈরি, সংবাদ সম্পাদনা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ তাকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। একারণে পরবর্তী প্রজন্মের অনেক সাংবাদিক তাঁকে শিক্ষক অনেক ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখতেন।
১৯৯৯ সালে গোলাম সারওয়ার দৈনিক যুগান্তর এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর সম্পাদনায় পত্রিকাটি বাংলাদেশে শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলোর আসনে অবস্থান করে নেয়। ২০০৫ সালে তিনি যুগান্তর ছেড়ে দৈনিক সমকাল প্রতিষ্ঠার সাথে যুক্ত হন এবং প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেটিও সফলতার শীর্ষে অবস্থান করে।
গোলাম সারওয়ার বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ভিত্তিক সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি) এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সহ-সভাপতি হিসেবেও একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেন এবং সম্পাদক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তাঁর সাহিত্যকর্মও তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে। তিনি একুশে পদক ছাড়াও বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তিনি শুধু সাংবাদিক নন, ছিলেন প্রতিষ্ঠানতুল্য সম্পাদক। তিনি এখনও অনেকের কাছে অনুকরণ ও অনুসরণীয়। আজ ১৩ আগস্ট মহান এই ব্যক্তির ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী। গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি তাঁকে। (প্রয়োজনীয় তথ্য সংগৃহীত)