
অনলাইন ডেস্ক ►
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ও আবেগময় এক অধ্যায়ের অবসান ঘটল। আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সিতে আর দেখা যাবে না ফুটবল ঈশ্বর লিওনেল মেসিকে। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের টানা টানাপোড়েন, ট্রফি খরা কাটিয়ে অর্জনের চরম শিখরে পৌঁছানোর পর অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
আর্জেন্টিনার হয়ে একের পর এক মহাকাব্যিক অধ্যায় রচনার পর এবং সাম্প্রতিক ফাইনাল ম্যাচ শেষে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ সময় চিন্তা-ভাবনা করার পর এই কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন অধিনায়ক মেসি। একটি অত্যন্ত আবেগঘন বার্তায় তিনি নিজের এই সিদ্ধান্তের কথা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তকে জানান। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, এটি তার জীবনের অন্যতম কষ্টদায়ক একটি সিদ্ধান্ত হলেও তিনি বিশ্বাস করেন—বিদায় জানানোর এটিই সেরা ও উপযুক্ত সময়।
বিদায়বেলায় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি জাতীয় দলের হয়ে একের পর এক রেকর্ড ভাঙা এই মহানায়ক। বিদায়ী বার্তায় তিনি তুলে ধরেন জাতীয় দলের হয়ে তার দীর্ঘ পথচলা এবং দেশের জার্সির প্রতি তার গভীর ভালোবাসার কথা। তিনি বলেন, ফাইনালের পর থেকে অনেক দিন ধরে চিন্তাভাবনা করার পর আমি সবাইকে জানাতে চাই যে, আমি জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল এবং এখনও হৃদয়ের গভীরে কষ্ট দিচ্ছে, তবে আমি অনুধাবন করতে পারছি যে সরে দাঁড়ানোর জন্য এটাই সঠিক সময়।
নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দেশের জন্য উজাড় করে দেওয়ার স্মৃতি স্মরণ করে মেসি আরও বলেন, আমি শপথ করে বলতে পারি, আমি সব সময় আমার সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। শুধু শেষ কয়েক বছরে নয়—যখন আমরা একের পর এক সব ট্রফি জিতেছি, বরং তার আগের কঠিন সময়গুলোতেও আমি একই উজাড় করে খেলেছি। আমি সব সময় লড়াই করেছি এবং এই জার্সির জন্য নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছি, যাতে আপনাদের একটু আনন্দ দিতে পারি এবং ফুটবলের মাধ্যমে একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে গর্বিত অনুভব করাতে পারি।
নিজের বিদায়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সময়ের স্বাভাবিক নিয়ম ও তরুণদের উঠে আসার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেন মেসি। তিনি মনে করেন, আর্জেন্টিনার ফুটবলে এখন এক ঝাঁক প্রতিশ্রুতিশীল তরুণের আগমনের সময় এসেছে, যাদের সুযোগ করে দেওয়া জাতীয় দলের ভবিষ্যতের জন্যই ইতিবাচক। অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনে মেসি উল্লেখ করেন যে, প্রতিটি দীর্ঘ ভ্রমণেরই একটি ইতি টানা প্রয়োজন। জাতীয় দলের সঙ্গে কাটানো সময়টা শেষ হওয়া তার জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হলেও বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা তাঁর রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে গেলেও আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের প্রতি তাঁর অনুভূতি বিন্দুমাত্র কমবে না। তিনি বলেন, আমি সব সময় জাতীয় দলের অংশ হওয়াকে ভালোবেসেছি, ভালোবাসছি এবং চিরকাল ভালোবেসে যাব। নিজের সামর্থ্য ও দেওয়ার মতো আর কিছুই বাকি নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার যা দেওয়ার ছিল, তার সবটুকু আমি দিয়ে দিয়েছি।
আমার মধ্যে আর নতুন করে দেওয়ার মতো কিছু অবশিষ্ট নেই। আর্জেন্টিনার ফুটবলে নতুন প্রজন্মের তরুণ খেলোয়াড়দের দ্রুত উঠে আসার প্রশংসাও করেন মেসি। তাঁর মতে, উদীয়মান এই বিশ্বমানের তরুণ খেলোয়াড়রা জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার শতভাগ দাবি রাখে এবং তাদের জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।
লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার কেবল কিছু সংখ্যা বা পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা অসম্ভব। জাতীয় দলের হয়ে শুরুর দিনগুলোতে একাধিক ফাইনাল হেরে যে চরম বিষাদ ও সমালোচনার সম্মুখীন তিনি হয়েছিলন, ক্যারিয়ারের শেষভাগে এসে ঠিক ততটাই বর্ণিল আলোয় নিজের ক্যারিয়ার রঙিন করেছেন। ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে অভিষেকের পর পরবর্তীতে দীর্ঘদিন ধরে তিনি সফল অধিনায়কত্ব করেন।
২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয়, মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়নশিপ এবং পরবর্তীতে বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট অর্জন করেন তিনি। ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপে দলকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে দেশের দীর্ঘ ৩৬ বছরের আক্ষেপ দূর করার পাশাপাশি আর্জেন্টিনার ফুটবলে নতুন আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি এবং বিশ্বমঞ্চে দলকে পুনরায় শীর্ষ স্থানে নিয়ে যেতে তাঁর অবদানের প্রভাব অপরিসীম।
মেসির এই আকস্মিক বিদায় ঘোষণার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমী, সাবেক তারকা এবং বিশ্লেষকদের মধ্যে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়াসহ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংবাদমাধ্যমগুলোতে এই মহাতারকার বিদায়কে একটি ঐতিহাসিক যুগের অবসান হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
যদিও আন্তর্জাতিক ফুটবলের রঙিন অধ্যায় থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন এই আর্জেন্টাইন জাদুকর, তবুও ফুটবল মাঠে তার রেখে যাওয়া পায়ের ছাপ এবং ফুটবলের প্রতি অসামান্য অবদান যুগ যুগ ধরে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। জাতীয় দলের হয়ে সব শিরোপা জয় করে একজন বিজয়ী অধিনায়ক হিসেবেই বিদায় নিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার।