Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ২ ঘন্টা আগে
  • ১২ বার দেখা হয়েছে
ফটো কার্ড

যমুনার ভাঙনে সব হারিয়েও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন বেলিজা

যমুনার ভাঙনে সব হারিয়েও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন বেলিজা

আসাদ খন্দকার,সাঘাটা ►
‎যমুনা নদীর ভাঙন বাংলাদেশের নদীতীরবর্তী মানুষের কাছে যেন এক নিত্যদিনের দুর্যোগ। একবার ভাঙন শুরু হলে চোখের সামনে বিলীন হয়ে যায় বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা ও বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা স্বপ্ন। নদীর স্রোতে শুধু মাটিই ভাঙে না, ভেঙে যায় মানুষের জীবনের হিসাব-নিকাশও। তবে সব হারিয়েও কেউ কেউ আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লেখেন। তেমনই এক সংগ্রামী নারী গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ঘুড়িদহ ইউনিয়নের চিনির পটল গ্রামের বেলিজা বেগম।

‎যমুনার ভাঙনে কয়েক দফায় বসতভিটা ও আবাদি জমি হারিয়ে একসময় প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল বেলিজা বেগমের পরিবার। স্বামী আক্তারুল ইসলাম, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসারে অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। স্থায়ী আয়ের কোনো উৎস না থাকায় সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় বহন করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল।

‎নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানোর পরও হাল ছাড়েননি বেলিজা। নতুন করে জীবন শুরু করার প্রত্যয়ে নদীর তীরে সাত শতক জমি কিনে গড়ে তোলেন বসতভিটা। কিন্তু মাথা গোঁজার ঠাঁই হলেই তো জীবন চলে না। প্রয়োজন ছিল পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী আয়ের পথ। ঠিক এমন সময় তার জীবনে আসে নতুন সম্ভাবনা। প্রায় দেড় বছর আগে মেননাইট সেন্ট্রাল কমিটি (এমসিসি) বাংলাদেশের সহযোগিতায় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বোনারপাড়া’র বাস্তবায়নে ‘বাংলাদেশের যমুনা নদীর তীরে ১ হাজার ৬০০ পরিবারের জন্য জলবায়ু অভিযোজিত খাদ্য নিরাপত্তা, জীবন-জীবিকায়ন ও দুর্যোগ প্রস্তুতি ( এসএফএসএলভি ফেস ২) প্রকল্পের আওতায় তিনি ‘প্রগতি নারী দল’-এর সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।‎তার খানা নম্বর—৩৩৪০- এফএসএল-০৩০৫৬।

‎বেলিজা বেগমের জীবনসংগ্রামের কথা বিবেচনা করে তাকে জলবায়ু অভিযোজিত ক্লাইমেট স্মার্ট মডেল বাড়ি সহযোগিতার আওতায় নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে তিনি প্রয়োজনীয় সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ পান। বসতভিটাই হয়ে উঠল সবুজ খামার ‎প্রশিক্ষণ ও পরামর্শকে কাজে লাগিয়ে বসতভিটার আশপাশের অল্প জায়গাকে উৎপাদনমুখী করে তোলেন বেলিজা। সেখানে গড়ে তোলেন মডেল সবজি বাগান। বাগানে উৎপাদন করছেন লালশাক, মূলাশাক, ধনিয়া, বেগুন, মরিচ ও টমেটোসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি।

‎শুধু সবজি চাষেই থেমে থাকেননি তিনি। বাড়িতে শুরু করেন হাঁস ও ছাগল পালন। নিয়মিত পরিচর্যা, প্রশিক্ষণ এবং প্রকল্পের পরামর্শে ধীরে ধীরে তার বসতভিটা পরিণত হয়েছে ছোট্ট একটি সবুজ খামারে। এই বাগান এখন শুধু পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদাই পূরণ করছে না, অতিরিক্ত উৎপাদিত সবজি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে নগদ অর্থও আয় করছেন বেলিজা। হাঁস ও ছাগল পালন থেকেও বাড়ছে পরিবারের আয়।

‎একসময় যে পরিবারটি চরম অভাব-অনটনের মধ্যে দিন কাটাত, সেই পরিবারে এখন ফিরেছে স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস। পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি সবজি বিক্রি করে নগদ আয় হচ্ছে। হাঁস-ছাগল পালনও হয়ে উঠেছে পরিবারের অন্যতম আয়ের উৎস। ‎বেলিজার এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্পও। নদীভাঙনে বারবার ঘরবাড়ি ও জমি হারানোর পর যে নারী একসময় ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ছিলেন, তিনিই এখন নিজের হাতে গড়ে তোলা বাগান ও গবাদিপশুর পরিচর্যা করে পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন।

‎বেলিজা বেগম বলেন, নদী আমার অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে, তবুও হাল ছাড়িনি। আজ নিজের হাতে গড়া ছোট সবজির বাগান, হাসিখুশি ছাগলগুলোই আমার নতুন আশার ঠিকানা। হারিয়ে যাওয়া জীবনকে আবার নতুন করে সাজানোর সাহস পেয়েছি এখান থেকেই। ‎বেলিজার এই কথায় ফুটে ওঠে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অদম্য জীবনসংগ্রামের চিত্র। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষের কাছে সামান্য সহায়তাও যে কত বড় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছেন তিনি।

‎বেলিজা বেগমের জীবনে প্রকল্পটির মাধ্যমে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। পরিবারের আয় বেড়েছে, খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা পূরণ হচ্ছে, অতিরিক্ত সবজি বিক্রি করে নগদ অর্থ আসছে এবং হাঁস-ছাগল পালনের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে সম্পদের নতুন উৎস। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে পরিবারের আত্মবিশ্বাসে। সীমিত জায়গা ও সীমিত সম্পদ ব্যবহার করেও যে আয় ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব, সেটিই প্রমাণ করছেন বেলিজা।

‎অনেকের মতে, নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার মানুষের জন্য শুধু ত্রাণ বা ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট নয়। তাদের এমনভাবে সহায়তা করা প্রয়োজন, যাতে তারা নিজেদের দক্ষতা ও স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদে আয় ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন। বেলিজা বেগমের উদ্যোগ সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ। ‎দুর্যোগ মানুষের জীবনকে থমকে দিতে পারে। কেড়ে নিতে পারে ঘরবাড়ি, জমি ও জীবিকার নিশ্চয়তা। কিন্তু সঠিক প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং নিজের চেষ্টা থাকলে সেই মানুষই আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।

‎বেলিজা বেগমের জীবন যেন তারই প্রমাণ। যমুনার ভাঙনে তিনি হারিয়েছেন ঘরবাড়ি, আবাদি জমি ও জীবিকার নিশ্চয়তা। কিন্তু হার মানেননি। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও নিজের কঠোর পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে তিনি তৈরি করেছেন নতুন জীবনের পথ। ‎তার ছোট্ট সবজি বাগান, হাঁস ও ছাগল পালন এখন শুধু পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর মাধ্যম নয়; এটি তার আত্মনির্ভরতার প্রতীক। ‎বেলিজার গল্প তাই শুধু একজন নারীর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নয়। এটি যমুনা নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য পরিবারের জন্য আশা, সাহস ও আত্মনির্ভরতার একটি বাস্তব উদাহরণ। নদী বারবার ভাঙতে পারে, কিন্তু মানুষের স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা যদি অটুট থাকে, তাহলে ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেও নতুন জীবনের গল্প লেখা সম্ভব।

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad