
প্রকৌশলী কে এম জয়নুল আবেদীন ►
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আজ (৫ অক্টোবর) জীবনের আট দশকেরও বেশি সময় পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার জীবনে শিক্ষকের সংখ্যা আসলে আমার ধারণার চেয়েও অনেক বেশি। কেউ আমাকে শ্রেণিকক্ষে পড়িয়েছেন, কেউ পেশাজীবনে পথ দেখিয়েছেন, আবার কেউ জীবনের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমাকে নতুন কিছু শিখিয়েছেন। তাঁদের সবার অবদান মিলেই আমার জীবন ও চিন্তাকে গড়ে তুলেছে। আমার শিক্ষাজীবনের শুরু আমার জন্মস্থান গাইবান্ধার পশ্চিমপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
সেখানকার শিক্ষকরাই প্রথম আমাকে বইয়ের জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর গাইবান্ধা হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ এবং তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এ আমার শিক্ষাজীবন এগিয়ে যায়। এসব প্রতিষ্ঠানের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা আমাকে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেননি; তাঁরা আমাকে ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। তখন মনে হতো, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করলেই বুঝি শিক্ষাজীবনেরও শেষ।
কিন্তু কর্মজীবনে প্রবেশ করার পর বুঝতে শুরু করলাম, আসলে শিক্ষার কোনো শেষ নেই। আমার দীর্ঘ পেশাজীবনে আমি পূর্ব পাকিস্তান পানি উন্নয়ন ব্যবস্থা, পাকিস্তান পাবলিক ওয়ার্কস, বাংলাদেশ পাবলিক ওয়ার্কস এবং মালয়েশিয়ান পাবলিক ওয়ার্কসের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। সেখানে বহু অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে কাজ করেছি। তাঁদের আমি আমার আরেক ধরনের শিক্ষক মনে করি। তাঁদের অভিজ্ঞতা, শৃঙ্খলা, কাজের প্রতি দায়িত্ববোধ, সাফল্য, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার পদ্ধতি এবং কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার ধরন-এসব আমার পেশাগত জীবনে অনেক কিছু শিখিয়েছে, যা কোনো পাঠ্যবই থেকে শেখা সম্ভব নয়।
কর্মজীবনের আরেকটি বড় শিক্ষা পেয়েছি বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে কাজ করে। আমার পেশাগত জীবনে ছয়টি ভিন্ন জাতীয়তার মানুষের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও চিন্তার মানুষের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বিস্তৃত হয়েছে। আমি শিখেছি, মানুষের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও একসঙ্গে কাজ করার জন্য পারস্পরিক সম্মান, বোঝাপড়া ও শেখার মানসিকতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাকে নিজের ওপর একটি বিশেষ আত্মবিশ্বাসও দিয়েছে।
আমি বুঝতে পেরেছিলাম-নতুন পরিবেশে গিয়ে যদি শেখার আগ্রহ থাকে, অন্যকে সম্মান করতে জানি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নিতে পারি, তাহলে পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় কাজ করার এবং অবদান রাখার সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব। আজ জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমার কাছে ‘শিক্ষক’ শব্দটির অর্থ আরও বড় হয়ে গেছে। শিক্ষক মানেই শুধু শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পড়ানো মানুষ নন। একজন জ্যেষ্ঠ সহকর্মী শিক্ষক হতে পারেন, একজন বন্ধু শিক্ষক হতে পারেন, এমনকি একজন তরুণও আমাদের শিক্ষক হতে পারেন। জীবনের কোনো কঠিন অভিজ্ঞতা, নিজের কোনো ভুল কিংবা পরিবর্তিত পৃথিবীও আমাদের অনেক কিছু শেখাতে পারে-যদি আমরা তা থেকে শেখার মানসিকতা রাখি।
তাই আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষার কোনো অবসরের বয়স নেই। আজও আমি শিখছি। নতুন প্রযুক্তি, নতুন চিন্তা, নতুন মানুষের জীবনধারা এবং পৃথিবীর পরিবর্তন আমাকে প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু শেখাচ্ছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি উপলব্ধি করেছি, শেখা শুধু পেশাগত দক্ষতা বাড়ায় না; এটি আমাদের চিন্তাভাবনা, আচরণ, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, সুখ, স্বাস্থ্য এবং মনের শান্তিকেও সমৃদ্ধ করতে পারে। আমার জন্মস্থান গাইবান্ধার তরুণদের কাছে তাই আমার একটি বিশেষ কথা বলার আছে। শিক্ষা শুধু একটি সার্টিফিকেট বা ডিগ্রি অর্জনের নাম নয়।
ডিগ্রি হয়তো জীবনের একটি দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু সারাজীবন শেখার মানসিকতাই আমাদের সামনে নতুন নতুন দরজা খুলে দেয়। তাই তরুণদের বলব-কৌতূহলী থাকুন, বেশি শুনুন, অভিজ্ঞ মানুষের কাছ থেকে শিখুন, আবার নিজের চেয়ে ছোটদের কাছ থেকেও শিখতে দ্বিধা করবেন না। নিজের ভুলকে ভয় পাবেন না; ভুল থেকেও শিক্ষা নেওয়া যায়। ভিন্ন মত ও ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে সম্মান করুন। আর কখনো মনে করবেন না যে আপনি সবকিছু জেনে গেছেন। আজ পেছনে ফিরে তাকালে আমার সবচেয়ে বড় কৃতজ্ঞতা শুধু তাঁদের প্রতি নয়, যাঁরা আমাকে শ্রেণিকক্ষে পড়িয়েছেন; তাঁদের প্রতিও, যাঁরা কর্মজীবনে আমাকে পথ দেখিয়েছেন এবং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন কিছু শেখার সুযোগ তৈরি করেছেন।
গাইবান্ধার পশ্চিমপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে গাইবান্ধা হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং দীর্ঘ কর্মজীবনের অসংখ্য অভিজ্ঞ মানুষের কাছে আমি আজীবন ঋণী। আমার জীবনে যদি সামান্য কোনো জ্ঞান বা প্রজ্ঞা অর্জিত হয়ে থাকে, তার পেছনে তাঁদের প্রত্যেকের কোনো না কোনো অবদান রয়েছে। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই আমার সব শিক্ষককে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। আর নতুন প্রজন্মের প্রতি আমার ছোট্ট বার্তা-শিখতে থাকুন, শুনতে থাকুন, নিজেকে প্রতিদিন একটু একটু করে উন্নত করুন। জীবনই সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়-আর জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই আমাদের জন্য কোনো না কোনো শিক্ষক অপেক্ষা করছেন।
লেখক ঃ সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, গণপূর্ত বিভাগ এবং ঢাকাস্থ গাইবান্ধাবাসী।