Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ১ ঘন্টা আগে
ফটো কার্ড

এখনও মজুরি বৈষম্যের শিকার গ্রাম্য নারীরা

এখনও মজুরি বৈষম্যের শিকার গ্রাম্য নারীরা

ভবতোষ রায় মনা
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে পুরুষ শ্রমিকের সমান তালে কাজ করেন তারা। তবুও দিনশেষে মজুরি পাওয়ার বেলায় জোটে পুরুষের অর্ধেক। গাইবান্ধার বিভিন্ন উপজেলায় নির্মাণ কাজ থেকে শুরু করে কৃষিক্ষেত, মিল-চাতাল ও হাট-বাজারে কর্মরত হাজার হাজার নারী শ্রমিক এভাবেই চরম মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে ন্যায্য পাওনা না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।

গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার রশিদা বেগম। অভাবের সংসারে চার সন্তানের মুখে অন্ন জোগাতে স্বামী রফিকুল ইসলামের সঙ্গে জমিতে দিনমজুরের কাজ করেন তিনি। রশিদা বলেন, "মোর সোয়ামি (স্বামী) জমিতে কাম করলে পায় ৫০০ টাকা, আর মুই একই সমান খাটনি দিয়া পাও মাত্র ২৫০ টাকা। খাটনি সমান হলেও মজুরির বেলা অর্ধেক। এই টাকা দিয়া ছাওয়া-পোয়া নিয়া চলা খুব কঠিন।"

রশিদা বেগমের মতো সব নারী শ্রমিকের একই অবস্থা, একই অভিযোগ রহিমা, বাছিরণ ও কুহিনুরদের। তারা জানান, অভাবের তাড়নায় বাধ্য হয়েই তারা সস্তায় শ্রম বিক্রি করছেন। ফুলছড়ি হাটে শুকনা মরিচের বস্তা তুললে পুরুষদের চেয়ে অনেক কম টাকা দেওয়া হয় নারীদের। দিনশেষে যেখানে পুরুষরা ভালো আয় করেন, সেখানে নারীদের হাতে জোটে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। 

একটি বেসরকারি সংগঠনের তথ্যমতে, গাইবান্ধার সাতটি উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৭ হাজার নারী শ্রমিক বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত। এর মধ্যে নির্মাণ খাতে রাজমিস্ত্রির যোগানদার ও ইটের খোয়া ভাঙার কাজে নিয়োজিত প্রায় ২ হাজার ৭০০ নারী। কৃষি ও গৃহস্থালি কাজেও নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণ খাতে কাজ করতে হলে রাজমিস্ত্রিদের নির্দিষ্ট হারে কমিশন দিতে হয় নারী শ্রমিকদের। এই কমিশন না দিলে অনেক সময় কাজও মেলে না।

বালাসীঘাট এলাকার একটি খাবার হোটেলে কর্মরত খায়রন বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করি। বাড়ির কর্তার একার আয়ে সংসার চলে না দেখে এখানে আসছি। কিন্তু মজুরি বৈষম্য দেখে মনে হয় আমরা মানুষ না। অর্ধেক মজুরি দেওয়া কি ন্যায়বিচার?"
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে পুরুষ শ্রমিকরা পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় চলে যাওয়ায় কৃষিতে শ্রমিকের সংকট দেখা দিচ্ছে। এই সুযোগে গৃহস্থ ও মালিকরা কম মজুরিতে নারী শ্রমিকদের নিয়োগ দিচ্ছেন। মজুরি নিয়ে দরকষাকষির সুযোগ না থাকায় মালিকপক্ষ নারীদের দিয়ে বেশি কাজ করিয়ে নিলেও টাকা দিচ্ছে কম। মূলত সস্তায় শ্রম পাওয়া যায় বলেই নির্মাণ ও কৃষি খাতে নারী শ্রমিকের চাহিদা ও সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। নারী শ্রমিকরা জানান, জেলায় তাদের অধিকার আদায়ের জন্য কোনো শক্তিশালী সংগঠন নেই। ফলে মজুরি বৃদ্ধি বা বৈষম্য নিরসনে তারা দাবি তুললেও তা কার্যকর হচ্ছে না। অসহায়ত্ব আর অভাবকে পুঁজি করে এক শ্রেণির মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগী তাদের শ্রম শোষণ করে চলেছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ গাইবান্ধা জেলা শাখার  সাধারণ সম্পাদক রিকতু প্রসাদ বলেন, মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন না নারীরা। বঞ্চিত হচ্ছেন ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা থেকেও। একই পরিশ্রমে একজন পুরুষ শ্রমিক দিনে পাচ্ছেন ৫শ টাকা আর নারী হলে ২৫০ টাকা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নারীর প্রতি এই মজুরি বৈষম্য দূর করতে হলে সরকারি তদারকি বাড়ানো এবং সমান কাজে সমান মজুরি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় এই বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী নারী দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে কখনোই বেরিয়ে আসতে পারবেন না।

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad