Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ১ ঘন্টা আগে
  • ২৩ বার দেখা হয়েছে
ফটো কার্ড

এগ্রো ও রিভার ট্যুরিজমের সম্ভাবনায় উজ্জ্বল গাইবান্ধা

এগ্রো ও রিভার ট্যুরিজমের সম্ভাবনায় উজ্জ্বল গাইবান্ধা

কায়সার রহমান রোমেল ►
আজ ২৭ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব পর্যটন দিবস। বিশ্বজুড়ে যখন দিবসটি টেকসই পর্যটন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বার্তা নিয়ে পালিত হচ্ছে, তখন নদীবিধৌত জেলা গাইবান্ধার জন্য দিনটির তাৎপর্য অন্যরকম। ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, তিস্তা, ঘাঘট ও করতোয়া এই পাঁচ নদীর পলিতে গড়া এই জেলা এক ভৌগোলিক বিস্ময়। একদিকে প্রতিবছর নদীভাঙনের মানবিক বিপর্যয়, অন্যদিকে পানি নেমে যাওয়ার পর জেগে ওঠা শত শত একর উর্বর পলি ও চরাঞ্চলের অফুরন্ত অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এই দুই বাস্তবতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে গাইবান্ধার পর্যটন-পরিচয়।

দীর্ঘদিন বন্যা ও নদীভাঙনপ্রবণ জেলা হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চল এখন খুলে দিচ্ছে বিনোদন ও স্থানীয় অর্থনীতির নতুন দুয়ার। নদীতীরের বিশাল জলরাশি, বালুচরের সূর্যাস্ত, সোনালি ভুট্টার খেত, লাল মরিচের বিস্তার আর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এক অনন্য স্থাপত্যশৈলী মিলিয়ে গাইবান্ধা হয়ে উঠতে পারে এগ্রো ও রিভার ট্যুরিজমের নতুন কেন্দ্র।

নদীর ক্যানভাসে রিভার ট্যুরিজম
গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ ও সাঘাটা এই চার উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও তিস্তার প্লাবনভূমি। জেলাশহর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে ঐতিহাসিক বালাসী ঘাট এই নদীভিত্তিক পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র। নব্বইয়ের দশকে তিস্তামুখ ঘাট থেকে ফেরি সার্ভিস বালাসীতে সরিয়ে আনার পর, এটি উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর সংযোগের অন্যতম নৌপথ হয়ে ওঠে। যমুনা সেতু চালুর পর রেলওয়ে ফেরি বন্ধ হলেও ঘাটের আকর্ষণ কমেনি, বরং বেড়েছে। বিআইডাব্লিউটিএ নির্মিত অবকাঠামো, ট্রাক টার্মিনাল, রেস্ট হাউস আর নদ-নদীর ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ রক্ষাবাঁধ এখন পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ।

বর্ষায় নদীর পূর্ণ যৌবনা রূপ দেখতে ভিড় জমান পর্যটকরা; শীতে চরের বালুকাবেলায় ফুটে ওঠে ভিন্ন দৃশ্যপট। বিকেলের আলোয় বালাসী ঘাট থেকে দূরে দেখা যায় ভারতের গারো পাহাড়ের আবছায়া আর নদীর বুকে সূর্যাস্তের রঙের খেলা। বালাসী ছাড়াও ফুলছড়ি, কামারজানি, সৈয়দপুর, শ্রীপুর ও হরিপুর ঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা সম্ভব সুসংগঠিত রিভার ট্যুরিজম নেটওয়ার্ক। সম্প্রতি হরিপুর-চিলমারী সংযোগস্থলে চালু হওয়া ১,৪৯০ মিটার দীর্ঘ তিস্তা সেতু (মওলানা ভাসানী সেতু) নদী পর্যটনে যোগ করেছে নতুন গতি; এলজিইডি নির্মিত দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ এই সেতু দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।

চরের বুকে কৃষি বিপ্লব
বাংলাদেশে এগ্রো ট্যুরিজম নতুন ধারণা হলেও গাইবান্ধার চরাঞ্চল এই সম্ভাবনার অনুপম ক্ষেত্র। জেলা প্রশাসনের ব্র্যান্ডিং স্লোগানেই তার প্রমাণ ‘স্বাদে ভরা রসমঞ্জুরীর ঘ্রাণ, চরাঞ্চলের ভুট্টা-মরিচ গাইবান্ধার প্রাণ।’ একসময়ের অনুৎপাদনশীল বালুচর, পলি জমতে জমতে এখন সবুজ-সোনালি শস্যক্ষেত। মোল্লারচর, কামারজানি, কঞ্চিপাড়া, এরেন্ডাবাড়ি, ফজলুপুর ও হরিপুরের মতো ১৬৫টি চরে বর্ষার পানি নামলেই শুরু হয় কৃষি উৎসব।

ফুলছড়ি ও সদর উপজেলার চরে প্রতিবছর প্রায় ১,৭২৫ হেক্টর জমিতে মরিচের আবাদ হয়, উৎপাদন প্রায় ২,৮১৩ মেট্রিক টন। শুষ্ক মৌসুমে চরের বালুতে মরিচ শুকানোর দৃশ্য যেন লাল গালিচা বিছানো। ফুলছড়ির পুরোনো উপজেলা মাঠে ২০০৪ সাল থেকে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার বসা ঐতিহ্যবাহী মরিচের হাট এক আকর্ষণীয় গ্রামীণ অভিজ্ঞতা।

সোনালি ভুট্টাও চরাঞ্চলের প্রধান ফসল ১৩,৪৪৫ হেক্টরের বেশি জমিতে চাষ হয়, বার্ষিক উৎপাদন ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি। শীত থেকে বসন্ত পর্যন্ত চর জুড়ে বিস্তৃত ভুট্টার খেত নগরকেন্দ্রিক মানুষের জন্য অপূর্ব দৃশ্যমান অভিজ্ঞতা। এছাড়া মিষ্টি কুমড়া, সরিষা, তিল, চীনাবাদাম, কাউন আর বিষমুক্ত সবজির আবাদ মিলিয়ে চরাঞ্চলে গড়ে উঠছে এক ঋতুভিত্তিক কৃষি-ল্যান্ডস্কেপ, যেখানে পর্যটকরা কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি তাজা শস্য কিনে গ্রামীণ জীবনের স্বাদ পান। ১৯৪০ সালে শহরের রমেশ সুইটস্-এর রমেশ ঘোষের উদ্ভাবিত বিখ্যাত ‘রসমঞ্জুরী’ গাইবান্ধার খাদ্য সংস্কৃতিকে দিয়েছে বিশেষ পরিচয়।

স্থাপত্য ও আতিথেয়তার আধুনিক পরশ
ফুলছড়ির মদনেরপাড়া গ্রামে ৮ বিঘা জমিতে গড়ে ওঠা বিশ্বখ্যাত ‘ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার’ স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরীর নকশায় ২০১২ সালে নির্মিত ৩২ হাজার বর্গফুটের এই ভবনের ছাদ আর চারপাশের ভূমি একই সমতলে, ছাদ জুড়ে সবুজ ঘাস, মাটির নিচে নির্মিত হওয়ায় ভেতরের তাপমাত্রা থাকে অনুকূল। এই স্থাপনা জিতেছে লন্ডনের ‘এআরপ্লাসডি অ্যাওয়ার্ড’ ও মর্যাদাপূর্ণ ‘আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার’।

আবাসন সংকট মেটাতে রাধাকৃষ্ণপুরে প্রায় ৬০ বিঘা জুড়ে গড়ে উঠেছে উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম ৪-স্টার রিসোর্ট ‘এসকেএস ইন্’ লেক, ওয়াটার ভিলা, সুইমিং পুল আর ৮০টি কক্ষ নিয়ে। এর সঙ্গে যুক্ত গোবিন্দগঞ্জের ‘রাজা বিরাট’-এর প্রত্নতাত্ত্বিক ঢিবি, দাড়িয়াপুরের ১০১১ খ্রিষ্টাব্দের শাহ সুলতান গাজীর মসজিদ, মাস্তা মসজিদ, ঘাঘট লেক ও পৌর পার্ক যা সমৃদ্ধ করেছে সাংস্কৃতিক পর্যটনকে।

চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
সম্ভাবনা বিপুল হলেও প্রকৃতির প্রতিকূলতা আর অবকাঠামোর অভাবে তা পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। বর্ষায় নদীর পানি বিপৎসীমার কাছে পৌঁছালে চরাঞ্চল প্লাবিত হয়, ডুবে যায় সড়ক, পানি নামার সময় শুরু হয় তীব্র ভাঙন; বদলে যায় চরের মানচিত্র। এছাড়া নিরাপদ নৌযান, লাইফ জ্যাকেট, মানসম্মত রেস্টহাউস, বিশুদ্ধ পানি ও পর্যাপ্ত গাইডের অভাব পর্যটকদের বড় সমস্যা।

এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দরকার সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান। বালাসী ঘাট থেকে নদী রক্ষাবাঁধ এলাকা ও স্থিতিশীল চর নিয়ে গড়ে তুলতে হবে ‘ইকো-ট্যুরিজম জোন’ পরিবেশবান্ধব বাঁশ-কাঠের ভাসমান কটেজ, বায়ো-টয়লেট ও সৌরবিদ্যুৎচালিত বিশ্রামাগার দিয়ে। চালু করা দরকার ‘কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজম’ মডেল, যাতে চরের কৃষকরা সরাসরি যুক্ত হন পর্যটন সেবায় এটি নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য বিকল্প আয়ের পথ খুলে দেবে। নৌ-পুলিশের তদারকিতে পর্যটন নৌকায় ফিটনেস সনদ ও লাইফ জ্যাকেট বাধ্যতামূলক করা, বিআইডাব্লিউটিএর অবকাঠামো সহজলভ্য করা এবং মরিচের হাট ও তিস্তা সেতু ঘিরে ডে-ট্যুর প্যাকেজ চালুর পরামর্শও দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রমত্তা নদী গাইবান্ধার মানুষের জীবনে নদীভাঙনের ট্র্যাজেডি লিখে দেয় ঠিকই, কিন্তু রেখে যায় পলিমাটির আশীর্বাদ আর চোখজুড়ানো সৌন্দর্যও। সরকারের স্থায়ী নদীশাসন পদক্ষেপ, দূরদর্শী নীতি আর স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে রূপসী ব্রহ্মপুত্র আর চরের সোনালি ফসলের গাইবান্ধাই হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ও টেকসই এগ্রো-রিভার ট্যুরিজমের রোল মডেল।

কায়সার রহমান রোমেল, লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad