Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ২ ঘন্টা আগে
ফটো কার্ড

গরমে অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি, স্বস্তি না বিপদ?

গরমে অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি, স্বস্তি না বিপদ?

অনলাইন ডেস্ক►
প্রচণ্ড গরমে বাইরে থেকে ঘরে ফিরেই অনেকের প্রথম কাজ হলো ফ্রিজ খুলে এক গ্লাস বরফ-শীতল পানি পান করা। মুহূর্তের মধ্যে শরীর যেন কিছুটা স্বস্তি পায়, ক্লান্তি কমে আসে এবং তৃষ্ণাও মিটে যায়। কিন্তু এই সাময়িক আরামের পেছনে একটি প্রশ্ন থেকেই যায় যে, অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি কি সত্যিই গরমে শরীরকে বেশি ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে, নাকি এর কিছু নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঠান্ডা পানি শরীরকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিলেও গরমে সুস্থ থাকার জন্য শুধু পানির তাপমাত্রা নয়, বরং পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই গ্রীষ্মের দাবদাহে বরফ-ঠান্ডা পানির গ্লাস হাতে নেওয়ার আগে জেনে নেওয়া দরকার এর উপকারিতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে।

তাৎক্ষণিক স্বস্তি, তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়
অতিরিক্ত গরমে ঠান্ডা পানি পান করলে মুখ, গলা ও পাকস্থলীতে শীতল অনুভূতি তৈরি হয়। এতে মস্তিষ্ক শরীরের তাপমাত্রা কমেছে বলে সংকেত পায় এবং মানুষ সাময়িক স্বস্তি অনুভব করে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের মূল তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে পানির তাপমাত্রার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো শরীরে পর্যাপ্ত তরল সরবরাহ বজায় রাখা। অর্থাৎ, খুব ঠান্ডা পানি পান করলে কিছু সময়ের জন্য আরাম মিললেও সেটি গরমের প্রভাব থেকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষা দেয় না।

শরীর কীভাবে নিজেকে ঠান্ডা রাখে?
মানবদেহের নিজস্ব একটি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। গরমে শরীর ঘামের মাধ্যমে অতিরিক্ত তাপ বাইরে বের করে দেয়। এই ঘাম বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার সময় শরীরকে ঠান্ডা করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তাই গরমে শুধু ঠান্ডা পানি নয়, পর্যাপ্ত পানি পান, হালকা পোশাক পরা এবং ছায়াযুক্ত স্থানে থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি পানে কি কি কোনো সমস্যা হতে পারে

বেশিরভাগ সুস্থ মানুষের জন্য ঠান্ডা পানি ক্ষতিকর নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি অস্বস্তির কারণ হতে পারে।

রক্তনালীর সংকোচন ও হজমের সমস্যা
অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি পানের পর তা যখন পরিপাকতন্ত্রে পৌঁছায়, তখন পাকস্থলীর আশেপাশের রক্তনালীগুলো সাময়িকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে। এর ফলে রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয় এবং খাবার হজম করার জন্য শরীরের যে স্বাভাবিক তাপমাত্রা প্রয়োজন, তা বজায় রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ফলে পরিপাক প্রক্রিয়া ধীরগতির হয়ে পড়তে পারে।

ভেগাস নার্ভের ওপর প্রভাব
হঠাৎ খুব ঠান্ডা পানি পান করলে শরীরের ভেগাস নার্ভ উদ্দীপিত হতে পারে। এই স্নায়ুটি শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, যা হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে এলে এই স্নায়ু উত্তেজিত হয়ে সাময়িকভাবে হৃদস্পন্দন কমিয়ে দিতে পারে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

শরীরের তাপমাত্রা সামঞ্জস্যের চ্যালেঞ্জ
বাইরের অতিরিক্ত গরম তাপমাত্রার সাথে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রার একটি সামঞ্জস্য থাকে। হঠাৎ খুব ঠান্ডা পানি পানের ফলে শরীরকে সেই পানির তাপমাত্রা শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় (প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস) নিয়ে আসতে অতিরিক্ত শক্তি ক্ষয় করতে হয়। এর ফলে শরীর তাৎক্ষণিকভাবে শীতল হলেও অভ্যন্তরীণভাবে কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে।
সর্দি-কাশি ও সাইনাসের সমস্যা
গরম থেকে ফিরেই হুট করে বরফ-ঠান্ডা পানি খেলে শ্বাসনালীতে শ্লেষ্মার অতিরিক্ত আস্তরণ তৈরি হতে পারে। এর ফলে গলা ব্যথা, টনসিল ফুলে যাওয়া বা সর্দি-কাশির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যাদের সাইনাস বা অ্যাজমার সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।
মাথাব্যথার কারণ হতে পারে
খুব দ্রুত বরফ-ঠান্ডা পানি পান করলে কিছু মানুষের “ব্রেইন ফ্রিজ” বা আকস্মিক মাথাব্যথা হতে পারে। যদিও এটি সাধারণত ক্ষণস্থায়ী এবং গুরুতর কোনো সমস্যা নয়।

গরমে পানির আদর্শ তাপমাত্রা কত হওয়া উচিত?
পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকদের মতে, গরমে শরীরকে সুস্থ ও হাইড্রেট রাখতে মৃদু ঠান্ডা বা ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি পান করা সবচেয়ে কার্যকর। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস (প্রায় ৫০-৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) তাপমাত্রার পানি পান করার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। এই তাপমাত্রার পানি শরীর দ্রুত শোষণ করতে পারে এবং এটি হজম প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যাঘাত ঘটায় না। মাটির কলসিতে রাখা পানি প্রাকৃতিকভাবে এই তাপমাত্রায় থাকে, যা গরমে স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপযোগী হতে পারে।

গরমে পানির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—

পিপাসা লাগার আগেই নিয়মিত পানি পান করা।
দীর্ঘ সময় রোদে থাকলে পানি ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখা।
একবারে অনেক পানি না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার পান করা।
অতিরিক্ত ঘাম হলে ডাবের পানি, লেবুর শরবত বা ওরাল স্যালাইন গ্রহণ করা।
কারা বেশি সতর্ক থাকবেন?
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি পান করার সময় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন—

শিশু
বয়স্ক ব্যক্তি
হাঁপানি বা শ্বাসতন্ত্রের কিছু সমস্যায় ভোগা মানুষ
সংবেদনশীল দাঁতের রোগী
আইবিএস বা হজমজনিত সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি
তাদের ক্ষেত্রে খুব বেশি ঠান্ডা পানির পরিবর্তে স্বাভাবিক বা হালকা ঠান্ডা পানি বেশি আরামদায়ক হতে পারে।

প্রচণ্ড গরমে অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি পান করলে তাৎক্ষণিক স্বস্তি পাওয়া যায়, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এটি গরম থেকে রক্ষা পাওয়ার জাদুকরি সমাধান নয়। বরং শরীরকে সুস্থ ও সতেজ রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যাপ্ত পানি পান করা, ঘামের মাধ্যমে হারানো তরল পূরণ করা এবং ডিহাইড্রেশন এড়িয়ে চলা। তাই গরমে এক গ্লাস বরফ-ঠান্ডা পানি খেতে চাইলে খেতে পারেন, কিন্তু সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি হলো নিয়মিত ও পর্যাপ্ত পানি পান করার অভ্যাস।

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad