
ডা. প্রীতম কর্মকার ►
আমাদের দাঁতের সমস্যা যখন শুরু হয়, তখন আমরা অনেকেই এর গুরুত্ব দিই না। আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে-দাঁতে কোনো ব্যথা বা সমস্যা না থাকলে ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। অথচ দাঁতে ব্যথা, শিরশির অনুভূতি বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দেওয়ার শুরুতেই যদি একজন বিডিএস পাস করা মুখ ও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া হয়, তাহলে বেশির ভাগ সমস্যাই অল্প চিকিৎসাতেই সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু অবহেলার কারণে সমস্যা জটিল হয়ে গেলে অনেক সময় রুট ক্যানেল, ডেন্টাল ক্যাপ বা এমনকি দাঁত ফেলে দেওয়ারও প্রয়োজন হতে পারে। মানুষ যেমন শরীর সুস্থ রাখতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করায়, তেমনি মুখ ও দাঁতের সুস্থতার জন্যও নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বছরে অন্তত একবার একজন বিডিএস পাস করা মুখ ও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে মুখ ও দাঁতের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত। দাঁতের ক্ষয় (উবহঃধষ ঈধৎরবং) যদি প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করা যায়, তাহলে সাধারণত ফিলিং বা অল্প চিকিৎসাতেই এটি ভালো করা সম্ভব। কিন্তু অবহেলার কারণে ক্ষয় যদি দাঁতের স্নায়ু পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন অনেক সময় রুট ক্যানেল, ডেন্টাল ক্যাপ বা দাঁত ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। অনেকের দাঁত ব্রাশ করার সময় রক্ত পড়ে, মাড়ি ফুলে যায় বা মুখে দুর্গন্ধ হয়। অনেকেই এসব সমস্যাকে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু দীর্ঘদিন অবহেলা করলে মাড়ির সংক্রমণ বাড়তে বাড়তে দাঁতের চারপাশের হাড় ক্ষয় হতে পারে। ফলে দাঁত নড়ে যেতে পারে এবং একসময় পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপ করলে দাঁত ও মাড়ির অধিকাংশ সমস্যাই প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব, ফলে চিকিৎসা সহজ, কম সময়সাপেক্ষ এবং তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল হয়। অনেক বাবা-মা মনে করেন, বাচ্চাদের দুধ দাঁত তো একসময় পড়ে যাবে, তাই এর চিকিৎসা বা যত্নের প্রয়োজন নেই। কিন্তু যখন দাঁতের ব্যথায় বাচ্চা ঘুমাতে পারে না, মুখ ফুলে যায় বা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাঁরা চিকিৎসকের কাছে আসেন। সেই সময় অসুস্থ ও ভীত শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া অনেক কঠিন হয়ে যায়। তাই অভিভাবকদের প্রতি আমার পরামর্শ-আপনার সন্তানের দুধ দাঁতের যত্ন নিন। একটি দুধ দাঁতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাচ্চাদের ২০টি দুধ দাঁত ভবিষ্যতের ৩২টি স্থায়ী দাঁতের জন্য জায়গা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
তাই ছোটখাটো কোনো সমস্যা দেখা দিলে দেরি না করে ডেন্টিস্টের কাছে নিয়ে আসুন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করান। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাড়ির রোগ, দাঁতের সংক্রমণ এবং ক্ষত সারতে দেরি হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। তাই তাঁদের ডেন্টাল চিকিৎসা শুরু করার আগে ডেন্টিস্টকে রক্তে শর্করার মাত্রাসহ প্রয়োজনীয় কিছু বিষয় পর্যালোচনা করতে হয়, যাতে নিরাপদ ও সফলভাবে চিকিৎসা দেওয়া যায়। আপনার দাঁত সুস্থ রাখতে প্রতিদিন অন্তত দুইবার, দুই মিনিট সময় ধরে ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করুন। ধূমপান, পান, সুপারি ও জর্দা খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা পরিহার করুন। মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়ার পর মুখ ভালোভাবে কুলি করুন এবং নিয়মিত দাঁত পরিষ্কার রাখুন।
এছাড়া বছরে অন্তত একবার একজন বিডিএস পাস করা মুখ ও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে মুখ ও দাঁতের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নিন। মনে রাখবেন, দাঁত শুধু খাবার চিবানোর জন্যই নয়; এটি আমাদের স্পষ্টভাবে কথা বলতে, সুন্দরভাবে হাসতে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চলাফেরা করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই আজই আপনি এবং আপনার পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপের অভ্যাস গড়ে তুলুন। আপনার সামান্য সচেতনতাই আপনার প্রাকৃতিক দাঁতকে দীর্ঘদিন সুস্থ ও সুন্দর রাখতে সাহায্য করবে।
লেখক: ডা. প্রীতম কর্মকার, মুখ ও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ সার্জন B.D.S (Dental Surgery) BMDC