
সুলতান মাহমুদ ►
দিনাজপুরের দুর্গা পূজামণ্ডপে গুলিতে চলছে প্রতিমা তৈরীর ব্যস্ততা। প্রতিমা তৈরির কারখানাগুলোতে রাত-দিন এক করে কাজ করছেন প্রতিমাশিল্পীরা।বাঁশ, কাঠ, খড় ও মাটির সমন্বয়ে ধীরে ধীরে দেবী দুর্গাসহ অন্য দেব-দেবীর প্রতিমা পাচ্ছে পূর্ণাঙ্গ রূপ। কোথাও চলছে মাটির শেষ প্রলেপ, কোথাও রঙের কাজ, আবার কোথাও প্রতিমার পোশাক ও অলংকার পরানোর প্রস্তুতি।
দিনাজপুর জেলার ১৩টি উপজেলায় এবার ১ হাজার ২৮৬টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছরের তুলনায় এ বছর ১৬টি মণ্ডপ বেড়েছে। ফলে পূজার আয়োজন ঘিরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় উৎসাহ-উদ্দীপনাও বেড়েছে। এরই মধ্যে অধিকাংশ মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। একই সঙ্গে ডেকোরেশন, আলোকসজ্জা ও মণ্ডপসজ্জার কাজও এগিয়ে চলছে।
দিনাজপুর শহরের বিভিন্ন মন্দির ও প্রতিমা তৈরির কারখানা ঘুরে দেখা যায়, শিল্পীদের ব্যস্ততার যেন শেষ নেই। কেউ বাঁশ ও কাঠ দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরি করছেন, কেউ খড় দিয়ে অবয়ব তৈরি করছেন, আবার কেউ মাটির প্রলেপ দিয়ে প্রতিমার শরীরের বিভিন্ন অংশ নিখুঁত করে তুলছেন। মাটি শুকানোর পর শুরু হবে রং ও সাজসজ্জার কাজ।
প্রতিমা তৈরির প্রক্রিয়ায় প্রথমে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয় মূল কাঠামো। এরপর তাতে খড় বাঁধা হয়। খড়ের ওপর কয়েক দফায় দেওয়া হয় মাটির প্রলেপ। মাটি শুকিয়ে গেলে প্রতিমার শরীর ও মুখমণ্ডলের বিভিন্ন অংশে সূক্ষ্ম কারুকাজ ফুটিয়ে তোলা হয়। সবশেষে রং, পোশাক, গহনা ও অন্যান্য সাজসজ্জার মাধ্যমে প্রতিমাকে দেওয়া হয় পূর্ণাঙ্গ রূপ। বিশেষ করে দেবী দুর্গার মুখমণ্ডল ও চোখ আঁকার সময় শিল্পীদের অতিরিক্ত সতর্কতা ও দক্ষতার প্রয়োজন হয়।
প্রতিমাশিল্পীরা জানান, একটি পূর্ণাঙ্গ দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে প্রায় দুই মাস বা তারও বেশি সময় প্রয়োজন হয়। মণ্ডপের আকার, প্রতিমার নকশা ও আয়োজকদের চাহিদার ওপর নির্ভর করে সময় কম-বেশি হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে এখন তাদের সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে।
প্রতিমাশিল্পী নরেশ পাল বলেন, “দুর্গাপূজার প্রতিমা তৈরি আমাদের কাছে শুধু পেশা নয়, এটি শিল্প ও ঐতিহ্যের অংশ। একটি কাঠামোকে ধীরে ধীরে মাটি দিয়ে প্রতিমার রূপ দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সেটিকে সুন্দর করে তোলা অনেক পরিশ্রমের কাজ। পূজার সময় ঘনিয়ে আসায় এখন দিন-রাত কাজ করতে হচ্ছে। তবে প্রতিমা তৈরির পর মানুষের আনন্দ দেখে আমাদের পরিশ্রম সার্থক মনে হয়।
আরেক প্রতিমাশিল্পী খকেন পাল বলেন, প্রতিমার কাঠামো তৈরি থেকে শুরু করে মাটি দেওয়া, শুকানো, রং করা ও সাজসজ্জা—প্রতিটি ধাপেই সময় লাগে। এখন কাজের চাপ অনেক বেড়েছে। সময়মতো প্রতিটি প্রতিমা নিখুঁতভাবে তৈরি করে মণ্ডপে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। স্থানীয় বাসিন্দা দীনেশ চন্দ্র রায় বলেন, দুর্গাপূজা শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি এখন সবার অংশগ্রহণে একটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ দেখে এখন থেকেই উৎসবের আমেজ অনুভূত হচ্ছে।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা সুবীর চন্দ্র রায় বলেন, পূজার দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, মানুষের মধ্যে উৎসাহও তত বাড়ছে। প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমরা চাই, উৎসবটি যেন আনন্দঘন পরিবেশে এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রেখে সম্পন্ন হয়।
দিনাজপুর জেলা পূজা উদযাপন কমিটির নির্বাহী সদস্য প্রদীপ ঘোষ বলেন, এবার জেলার ১৩টি উপজেলায় ১ হাজার ২৮৬টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। পূজাকে ঘিরে বিভিন্ন মণ্ডপে প্রস্তুতি চলছে। মণ্ডপসজ্জা, প্রতিমা তৈরি ও অন্যান্য কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য আয়োজকরা কাজ করছেন। একই সঙ্গে পূজার আয়োজন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
দিনাজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন বলেন, দুর্গাপূজা উপলক্ষে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে সভা করা হয়েছে। পূজামণ্ডপগুলোতে স্বেচ্ছাসেবী টিম গঠনের জন্যও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পূজার নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতিটি পূজামণ্ডপ সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাতে নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা সম্পন্ন করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।