
প্রকৌশলী কে এম জয়নুল আবেদীন ►
প্রাচীন পুরাণ, আধুনিক মানুষের বেদনা এবং সাহিত্যিক উদ্ভাবনের এক অনন্য শিল্পী। সাহিত্য কেবল গল্প বলা কিংবা কবিতার ছন্দে অনুভূতি প্রকাশের নাম নয়। সাহিত্য মানুষের মনের গভীরতা, জীবনের জটিলতা এবং সময়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে নতুনভাবে চিনতে শেখায়। কানাডার কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসনের সাহিত্যকর্ম সেই চিন্তারই এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। ২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভের মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যিক অবদান বিশ্বব্যাপী নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তাঁর সৃষ্টির বিশেষত্ব হলো-প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও পুরাণের সঙ্গে আধুনিক মানুষের প্রেম, একাকিত্ব, শোক ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নকে মিলিয়ে দেওয়া। অ্যান কারসনের সাহিত্য সহজে কোনো একটি পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি কখনো কবিতার ভাষায় কথা বলেন, কখনো প্রবন্ধের যুক্তি ব্যবহার করেন, আবার কখনো ইতিহাস, পুরাণ ও ব্যক্তিগত স্মৃতিকে একত্র করেন। তাঁর লেখায় কবিতা ও গদ্যের মাঝখানে স্পষ্ট কোনো দেয়াল নেই। তিনি প্রচলিত সাহিত্যিক রীতিকে অন্ধভাবে অনুসরণ না করে নিজের ভাব প্রকাশের জন্য নতুন পথ তৈরি করেন।
ফলে তাঁর রচনা পাঠককে শুধু আনন্দ দেয় না, চিন্তা করতেও বাধ্য করে। তাঁর বিখ্যাত বই ঊৎড়ং ঃযব ইরঃঃবৎংবিবঃ প্রেমের স্বভাব নিয়ে এক গভীর অনুসন্ধান। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও দর্শনের আলোকে তিনি দেখিয়েছেন, প্রেমের মধ্যে আকর্ষণ ও দূরত্ব, আনন্দ ও কষ্ট পাশাপাশি থাকে। আমরা যাকে ভালোবাসি, তাকে সম্পূর্ণভাবে নিজের করে পাওয়ার আকাক্সক্ষা যেমন অনুভব করি, তেমনি তাকে হারানোর ভয়ও আমাদের মনে কাজ করে। কারসন এই জটিল অনুভূতিকে শুধু আবেগের বিষয় হিসেবে দেখেননি; তিনি এর পেছনের মানবিক ও দার্শনিক প্রশ্নগুলোও তুলে ধরেছেন। অঁঃড়নরড়মৎধঢ়যু ড়ভ জবফ তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি।
গ্রিক পুরাণের গেরিয়ন নামের এক ডানাওয়ালা লাল দৈত্যের কাহিনিকে তিনি আধুনিক কবিতার আঙ্গিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। এখানে পুরাণ কেবল অতীতের গল্প নয়; এটি প্রেম, পরিচয়, আকাক্সক্ষা এবং মানসিক আঘাতের মতো বর্তমান জীবনের বিষয় প্রকাশের মাধ্যম। পুরোনো কাহিনিকে নতুন চোখে দেখার এই ক্ষমতা কারসনের সাহিত্যকে স্বতন্ত্র করেছে। তাঁর ঘড়ী বইটি শোক ও স্মৃতির এক ব্যতিক্রমী প্রকাশ। ভাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁকে স্মরণ করার জন্য কারসন এই বই নির্মাণ করেন। এতে কবিতা, অনুবাদ, ছবি, চিঠি এবং ব্যক্তিগত স্মৃতির নানা অংশ একত্র হয়েছে। বইটি প্রচলিত অর্থে ধারাবাহিক কাহিনি নয়।
বরং প্রিয়জনকে হারানোর পর মানুষের স্মৃতি কীভাবে বিচ্ছিন্নভাবে ফিরে আসে, তা এর গঠন ও ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে। এই কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শোককে সব সময় সরল ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না। ঞযব এষধংং ঊংংধু কবিতায় ব্যক্তিগত কষ্ট, সম্পর্কের ভাঙন এবং এমিলি ব্রন্টির সাহিত্য একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে। এখানে অন্য একজন লেখকের রচনা কবির নিজের জীবনকে বোঝার আয়না হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সাহিত্যিক ঐতিহ্যের এই সংযোগ তাঁর সৃষ্টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে কারসনের সাহিত্য সবার কাছে সমান সহজবোধ্য নাও হতে পারে।
তাঁর লেখায় ইতিহাস, পুরাণ ও দর্শনের উল্লেখ রয়েছে; কোথাও কোথাও ভাবের সংযোগ সরাসরি নয়, পাঠককে নিজেকেই অর্থ খুঁজে নিতে হয়। এ কারণে তাঁর রচনা মনোযোগ দিয়ে পড়তে হয়। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জই পাঠককে পরিচিত চিন্তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ দেয়। অ্যান কারসনের সাহিত্যিক গুরুত্ব এখানেই যে, তিনি পুরোনো জ্ঞানকে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করান এবং ব্যক্তিগত অনুভূতিকে বৃহত্তর মানবিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর রচনা মনে করিয়ে দেয়, সাহিত্য কোনো স্থির কাঠামো নয়; এটি মানুষের চিন্তা ও অনুভূতির মতোই পরিবর্তনশীল। ২০২৬ সালের নোবেল স্বীকৃতি তাই শুধু একজন লেখকের সম্মান নয়, সাহিত্যকে নতুনভাবে দেখার সাহস ও সৃজনশীলতারও স্বীকৃতি।
লেখক- সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, গণপূর্ত বিভাগ এবং ঢাকাস্থ গাইবান্ধাবাসী।