Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ৩ ঘন্টা আগে

মফস্বল সাংবাদিকতা: বঞ্চনা, বাস্তবতা ও সংস্কারের অনিবার্যতা

মফস্বল সাংবাদিকতা: বঞ্চনা, বাস্তবতা ও সংস্কারের অনিবার্যতা

মফস্বল সাংবাদিকতা: বঞ্চনা, বাস্তবতা ও সংস্কারের অনিবার্যতা...

হেদায়েতুল ইসলাম বাবু►

বছর কুঁড়ি আগে হাইস্কুলের বারান্দা থেকে আমার গণমাধ্যমে প্রবেশের দরজাটা ছিল স্থানীয় পত্রিকা। এরপর অনলাইন হয়ে গন্তব্য টেলিভিশনে। দেখতে দেখতে পত্রিকা ছেড়ে টেলিভিশনের পর্দায় হাঁটাচলার সময়টাও কম নয়। যুগ পার হয়েছে বছর তিনেক আগে। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি খুব একটা বদলায়নি স্থানীয় পত্রিকার স্বাস্থ্য। বড় জোর এক টাকার পত্রিকা দুই টাকা হয়েছে। কোনো দৈনিক আটকে আছে চার পৃষ্ঠার ট্যাবলয়েডে। কোনোটি অনিয়মিত। আবার কোনো পত্রিকা ট্যাবলয়েড থেকে আকারে বড় হয়েছে, সাদা-কালো থেকে হয়েছে রঙিন। কিন্তু পাঠকের চাহিদার জায়গাটা যেমন অপূর্ণ, তেমনি স্থানীয় পত্রিকায় কর্মরত সাংবাদিকদের প্রাপ্তির জায়গাটা এখনো পুরোপুরি শূন্য।

অপূর্ণ খবরের পিপাসা

খবরের পিপাসা মেটাতে প্রতিদিন সকালে খবরের কাগজে চোখ বুলিয়ে নেয়া এক প্রকার নেশায় পরিনত হয়েছে। খবরের তৃষ্ণা অপূর্ণ রেখেই স্থানীয় পত্রিকাগুলো টেবিলে রাখতে হয়। কারণ স্থানীয় পত্রিকায় নেই স্থানীয় খবর। প্রথম পাতা জুড়ে বিভিন্ন নিউজ এজেন্সির জাতীয় খবরে ঠাসা। ভেতরের পাতায় বিনোদন আর বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক থেকে কপি করা সম্পাদকীয় আর উপ-সম্পাদকীয়। শেষ পৃষ্ঠাতেও ঠাঁই পায়না স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ খবর। 

ওয়ান ম্যান নির্ভর পত্রিকা

কোনো কোনো স্থানীয় দৈনিক খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। এক ব্যক্তি নির্ভর পত্রিকা আগেও দেখেছি, এখনো দেখছি। কম্পিউটার অপারেটর নিজেই নিউজ এডিটর, নিজেই প্রুফ রিডার, নিজেই মেকআপম্যান। কখনো কখনো সার্কুলেশন ম্যানেজারের দায়িত্বটাও তার কাঁধে। কারো কারো খবরের ভরসা কেবল বিভিন্ন নিউজ এজেন্সি আর জাতীয়, আঞ্চলিক দৈনিকের অনলাইন ভার্সন। কোনো কোনো পত্রিকায় ছাপা হয় টার্গেট নিউজ। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করে যা ইচ্ছে তাই প্রকাশ করে অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করতে সংবাদ প্রকাশ করার টেন্ডেন্সি এখনো চোখে পড়ে। 

কার্ড সর্বস্ব, নিয়োগ বিহীন সাংবাদিক

স্থানীয়ভাবে যে দৈনিক, সাপ্তাহিক বা মাসিক পত্রিকাগুলো নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে প্রকাশ হয়, এসব পত্রিকার কোনটিই তাদের প্রতিনিধিদের নিয়োগপত্র দেয়না। আর নিয়োগপত্র না দিলে বিভিন্ন ইউনিয়ন বা থানা থেকে যারা খবর পাঠান- বেতন প্রত্যাশা করা তাদের জন্য অকল্পনীয়। দেয়ার মধ্যে একটা আইডি কার্ড দিয়েই পত্রিকা কর্তৃপক্ষ দায় সাড়ে। কোনো কোনো পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে আবার আইডি কার্ডের জন্য খুশি করার সেই পুরোনো প্রবণতা এখনো চলমান। ফলে প্রান্তিকে আইডি কার্ড ঝুলিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার অভিযোগ অহরহ পাওয়া যায় সাংবাদিক নামধারী অনেকের বিরুদ্ধে। ইদানিং শুনছি মোটরসাইকেল বাহিনীর চল শুরু হয়েছে। যারা দলবেঁধে মোটরসাইকেল নিয়ে দাপিয়ে বেড়ায়। ইটের ভাটা, বালির পয়েন্ট, মাটির পয়েন্ট এমন বিভিন্ন পয়েন্টে ঝাঁক বেঁধে শিকারে নামে তারা। সারা দিনে পাঁচশ হাজার শিকার করে পঞ্চাশ, একশ টাকা ভাগাভাগি করে বাড়ি ফেরে এমন গল্প প্রায়ই শুনছি। 

পেশাদার সংবাদকর্মীদের দূর্দশা

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমকে যে চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়, সেকথা সবারই জানা। আর এই স্তম্ভের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্থানীয় সাংবাদিকরা। রাজধানী থেকে দূরে, প্রান্তিক মানুষের সুখ-দুঃখ, অনিয়ম আর অধিকারের কথা যারা তুলে ধরেন, তারাই হলেন স্থানীয় সাংবাদিক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, যাদের লেখনীতে অন্যের অধিকার আদায়ের পথ সুগম হয়, তারা নিজেরাই আজ চরম অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার।

স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রধান সংকট হলো তাঁদের আর্থিক অনিশ্চয়তা। অধিকাংশ স্থানীয় পেশাদার সাংবাদিকদের বেতন-ভাতাহীন এক মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে। জাতীয় গণমাধ্যমের জেলা প্রতিনিধিরা বেতন বা সম্মানী যা পায়- তা উল্লেখ করার মতো নয়। অর্থাৎ এই বেতন বা সম্মানীর টাকায় পরিবার কেন একজন মানুষের মাসিক খরচ চালানো সম্ভব নয়।  আর জেলা পর্যায় থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোর নিজস্ব কোনো সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নেই। অনেক ক্ষেত্রে ইউনিয়ন বা উপজেলা প্রতিনিধিদের নিয়োগপত্র ছাড়াই বছরের পর বছর কাজ করতে হয়। মাসের পর মাস কাজ করার পরও তাদের কপালে জোটে না ন্যূনতম সম্মানী। বাধ্য হয়ে অধিকাংশ সাংবাদিককে জীবন চালাতে হয় অন্য কোনো পেশার ওপর নির্ভর করে অথবা চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে। ফলে সাংবাদিকতা পেশাদার গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে নেশা হয়ে থাকলেও, এটি পেশা হিসেবে টিকে থাকার শক্তি হারাচ্ছে- তা বলতে দ্বিধা নেই।

সুযোগ-সুবিধার অনুপস্থিতি

সরকারি ওয়েজবোর্ড বা সংবাদপত্রের নির্ধারিত সুযোগ-সুবিধা স্থানীয় সাংবাদিকদের জন্য কেবল একটি অলীক স্বপ্ন। উৎসব বোনাস, চিকিৎসা ভাতা বা ঝুঁকি বীমার মতো মৌলিক অধিকারগুলো তাদের চিন্তার বাইরে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় কোনো দুর্ঘটনায় পড়লে বা অসুস্থ হলে হাউসের পক্ষ থেকে সাহায্য পাওয়া তো দূরের কথা, অনেক সময় খোঁজও নেওয়া হয় না। এই নিরাপত্তাহীনতা যেমন তাদের কাজের স্পৃহা কমিয়ে দিচ্ছে তেমনি পেশাগত উৎকর্ষ সাধনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

লাঞ্ছনা ও পেশাগত ঝুঁকি

স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে পেশাদার সাংবাদিকদের বরাবরই প্রভাবশালী মহল, দুর্নীতিবাজ এবং স্থানীয় মাস্তানদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কাজ করতে হয়। রাজধানী কিংবা বিভাগীয় ও বড় বড় শহরের সাংবাদিকদের তুলনায় তারা সব সময়ই অনেক বেশি অরক্ষিত। সত্য সংবাদ প্রকাশের জেরে মিথ্যা মামলা, শারীরিক হামলা এমনকি প্রাণনাশের হুমকি তাদের নিত্যসঙ্গী। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় প্রশাসনের অসহযোগিতা এবং প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়তে হয়। একদিকে আর্থিক অনটন, অন্যদিকে জীবনের ঝুঁকি- এই দুয়ের চাপে পিষ্ট হয়ে স্থানীয় সাংবাদিকতা একদিকে পেশাদারিত্ব হারাচ্ছে, অপরদিকে এই পেশা চলে যাচ্ছে অপেশাদার এবং সুযোগ সন্ধানী, লোভীদের দখলে।

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব ও বাস্তবতা

২০২৪ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়কালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠণ করে। মফস্বলে কর্মরত সাংবাদিকরা গণমাধ্যম কমিশনের প্রতি একবুক আশা নিয়ে চাতক প্রতীক্ষায় ছিল। প্রত্যাশা ছিলো- তৃণমূলের সাংবাদিকদের দুঃখগাথা- কষ্টের গল্প এবার জাতীয় পর্যায়ে প্রতিধ্বনিত হবে। সেই আশায় গুড়েবালি। কারণ গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গত বছরের মার্চে প্রতিবেদন জমা দিলেও গণমাধ্যম সংস্কারের বিষয়ে অন্তর্বতী সরকার দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। শুধু তাই নয় কমিশনের যেসব সুপারিশের ভিত্তিতে জুলাই সনদ তৈরি করেছে ঐকমত্য কমিশন সেখানেও গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের কোনো কিছুই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অথচ কমিশনের সদস্যরা যখন দেশের ৭টি বিভাগীয় শহরে গণমাধ্যমের অংশীজনদের সাথে মতবিনিময় সভা করেছেন তখন স্থানীয় সাংবাদিকরা ছিলেন সেই আলোচনার প্রধান অংশীদার। দীর্ঘদিন বঞ্চিত মফস্বলের সাংবাদিকরা মাত্র দুইটি বিষয়ের সংস্কার চেয়েছিলেন। একটি হলো সাংবাদিকদের যোগ্যতা নির্ধারণ; আর অন্যটি সাংবাদিকদের আর্থিক, সামাজিক এবং আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

দীর্ঘদিন লাঞ্ছনা-বঞ্চণার শিকার মফস্বলের নিগৃহীত, অত্যাচারিত সাংবাদিকরা চেয়েছিলেন একটা উপযুক্ত বেতন কাঠামো নির্ধারণ করবে সরকার। যা দিয়ে একটা পরিবার সম্মানজনকভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। আর চাওয়া ছিলো এমন একটা ভয়হীন পরিবেশ, যেখানে সব চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে সত্যকে দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হবে। সব মিলিয়ে সাংবাদিকরা মূলত একজন পেশাজীবি সাংবাদিক হিসেবে নিরাপত্তাটা চেয়েছিলো। এই নিরাপত্তা বলতে তাদের আর্থিক, সামাজিক, পেশাগত  ও আইনগত সুরক্ষা। কমিশন সেই হিসেবেই তাদের সুপারিশমালা তৈরি করেছিল। যেখানে মূলত সাংবাদিকদের জন্য একটা মিনিমাম বেতন, আইনগত সুরক্ষা এবং বিনা কারণে চাকরি যাতে না যায় এবং কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো সাংবাদিককে  অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করলে বা তার প্রাপ্ত-বেতন ভাতা পরিশোধ না করলে কিংবা কোনো মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের সাথে কোনো সাংবাদিক কোনো অন্যায্য আচরণ করলে, চাকরির শর্ত ভঙ্গ করলে যেন সব পক্ষই ন্যায্য বিচার পান, সেজন্য একটা স্থায়ী মিডিয়া কমিশনের সুপারিশ করেছিল যার কোনো কিছুই এখনো আলোর মুখ দেখেনি। 

আমরা যদি একটা মিনিমাম বেতন স্কেল নির্ধারণের কথা বলি তাহলে সেটার জন্য সরকারের অংশীজনদের সাথে আলোচনা করার দরকার আছে। আমরা যদি সাংবাদিকতার সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নের কথা বলি তাহলে সেখানেও আইন মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা করার দরকার আছে এবং সেজন্য সরকার সময় নিতেই পারে, কিন্তু সেই সময়েরও একটা নির্দিষ্ট সময় থাকা প্রয়োজন যার বিষয়ে সরকার উদাসীন। আমরা যদি খুব ছোট ছোট প্রত্যাশার কথা বলি তাহলে এর মধ্যে সাংবাদিকদের যোগ্যতা নির্ধারণ একটা উদাহরণ হতে পারে। বিষয়টি সংস্কারের জন্য সরকারের আর কারো সাথে আলোচনার প্রয়োজন নেই। সেই ক্ষেত্রে কোনো সময়ের প্রয়োজন নেই। শুধু সরকারের ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন ছিল। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিষয়টি দফায় দফায় আলোচনায় আসলেও তার বাস্তবায়ন করা হয়নি। বর্তমান অন্তর্বতী সরকারও বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে। 

মিডিয়া হাউসগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো

সাংবাদিকদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা বাড়াতে হলে সবার আগে মিডিয়া হাউসগুলোর অর্থনৈতিক সুরক্ষা বাড়ানো জরুরি। কমিশন সেখানেও সুপারিশ করেছে। কমিশন সরকারি বিজ্ঞাপনের হার বাড়ানোর সুপারিশের পাশাপাশি বিভিন্ন ট্যাক্স-ভ্যাট কমানোরও সুপারিশ করেছিল। স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে বিজ্ঞাপনের হার বাড়াতে, বেসরকারি রেডিওগুলোতে সরকারি সংবাদ-বুলেটিন প্রচারের  জন্য কিছু অর্থ দেয়ার প্রস্তাব করেছিল। টেলিভিশনের রেটিং ব্যবস্থা টিআরপি সঠিকভাবে নির্ণয় করে সে অনুযায়ী তাদের বিজ্ঞাপন দেয়ার সুপারিশও করে কমিশন।

সংবাদ মাধ্যমে জেন্ডার সমতা, নৃতাত্ত্বিক, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়েও কমিশনের পরামর্শ ছিল। হাইকোর্ট প্রণীত যৌন নিপীড়ন রোধ নির্দেশ (২০০৯) অনুযায়ী প্রতিটি গণমাধ্যম কার্যালয়ে একটি প্রতিকার সেল তৈরি করার জন্যেও সুপারিশ করা হয়েছিল। এই ছোট ছোট সংস্কার করার জন্য সরকারের কারো সাথে কোনো আলোচনা বা পরামর্শ করার প্রয়োজন ছিল না। শুধু নির্বাহী আদেশ জারি করেই সরকার এই সংস্কারগুলো করতে পারতো, কিন্তু সরকার এখনো কিছুই করেনি।

সাংবাদিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ডিজিটাল প্লাটফর্মের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে শুরু হয়েছে গুজব, ভুলতথ্য এবং অপতথ্যের ছড়াছড়ি। অন্যকে ছোট করে বিদ্বেষ ছড়িয়ে বিভিন্ন স্বার্থানেষী গোষ্ঠী একদিকে প্রচাণায় নেমেছে- অন্যদিকে এআই ব্যবহার করে তৈরি ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে সত্যি আর মিথ্যা যাচাই করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কিন্তু এ নিয়ে সরকার কিংবা নির্বাচন কমিশনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। অথচ কমিশন থেকে মিডিয়া সাক্ষরতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল। সাংবাদিকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করা হয়েছিল। দেশে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের জন্য সরকারি এবং বেসরকারি যে ব্যবস্থা রয়েছে তা অপ্রতুল এবং সব সময় দেশের মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দিতেই বেশি আগ্রহী হয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। অথচ সারা দেশে অসংখ্য স্থানীয় পত্র-পত্রিকা রয়েছে। অসংসখ্য অ্যাকটিভ অনলাইন পোর্টাল রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে অসংখ্য সাংবাদিক। তাদের প্রশিক্ষণের জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। 

প্রেস কাউন্সিলের মতো অকার্যকর একটি প্রতিষ্ঠানের বিলুপ্তি সাধন করে স্থায়ী একটা মিডিয়া কমিশন প্রতিষ্ঠিত করার সুপারিশ করেছিলো কমিশন। যা সুপারিশেই সীমাবদ্ধ। অথচ প্রেস কাউন্সিলের জুরিসডিকশন এত কম যে বর্তমানে সবচেয়ে ভাইব্রেন্ট যে ডিজিটাল মিডিয়া সেটা কভার করে না। টেলিভিশন সাংবাদিকদের কোনো সমস্যার সমাধান প্রেস কাউন্সিল করতে পারে না। গ্রামীণ সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত অনৈতিক ও বেআইনিভাবে চাকরিচ্যুত হচ্ছেন, ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অথচ এই বিষয়ে প্রেস কাউন্সিলের ভূমিকা শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ। 

তাছাড়া প্রেস কাউন্সিলে মফস্বল সাংবাদিকের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। মিডিয়া সংক্রান্ত পলিসি মেকিংয়ের জায়গায় সংস্কার কমিশন ছাড়া কোথাও গ্রামীণ সাংবাদিকের প্রতিনিধিত্ব নেই বা ছিলনা। অথচ রাজধানী ঢাকার চেয়ে সারা দেশে মফস্বল সাংবাদিকদের সংখ্যা অনেক বেশি। রাজধানীতে সাংবাদিকদের যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেখানে মফস্বল সাংবাদিকদের কোনো কার্যকরী প্রতিনিধিত্ব নাই। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক একটা দেশের বেশিরভাগ পলিসিগত জায়গায় ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের কোনো প্রবেশাধিকার নেই। এটা শুধু অনাকাঙ্ক্ষিত নয় বরং একটা অবিচার। 

কর্মক্ষেত্রে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা এবং অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নিউজপেপার এমপ্লয়িজ (কন্ডিশনস অব সার্ভিস) অ্যাক্ট, ১৯৭৩ এবং শ্রম আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছিল গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন। কিন্তু এই সরকার গত আওয়ামী লীগ আমলের তৈরি খসড়া গণমাধ্যমকর্মী (চাকরির শর্তাবলী) আইন, ২০২১-এর ব্যাপারে অংশীজনের কাছে লিখিত মতামত চেয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় (১৭ অগাস্ট, ২০২৫)। অথচ দুই একটি শব্দ ও ব্যখ্যা ছাড়া গণমাধ্যমকর্মী আইনের খসড়া বাংলাদেশ শ্রম আইনের হুবহু নকল যা দীর্ঘদিন ধরে ঝুলিয়ে রেখেছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। এ দেশের মানুষের ঘাম ঝড়ানো ট্যাক্সের টাকা খরচ করে তৈরি করা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ যদি বাস্তবায়নই না করা হবে তাহলে জনগণের অর্থ কেন অপচয় করা হলো?

স্থানীয় সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা নিরসনে সাম্প্রতিককালে গঠিত ‘গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন’ যে আশার আলো হয়ে আবির্ভূত হয়েছিল। সেই আশার আলো যাতে নিভে না যায়। কমিশনের মাধ্যমে সরকারের কাছে পেশ করা সুপারিশমালায় সাংবাদিকদের জন্য ন্যূনতম বেতন স্কেল নির্ধারণ, জেলা প্রতিনিধিদের নির্দিষ্ট সময় পর পদোন্নতি, সংবাদপত্রের মালিকানা স্বচ্ছ করার প্রস্তাব বাস্তবায়নে দ্রুত উদ্যোগ দরকার। এছাড়া সাংবাদিকদের সুরক্ষায় একটি স্বাধীন ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন’ গঠন ও বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন সময়ের দাবি। তৃণমূলের সাংবাদিকরা চান- শুধু কাগজে-কলমে নয় কমিশনের প্রস্তাবগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়া হোক।

একইসাথে জেলা পর্যায়ের পত্রিকাগুলোতেও সরকারি ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী ন্যূনতম বেতন নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যেক সাংবাদিকের জন্য বৈধ নিয়োগপত্র এবং ঝুঁকি বিমা বাধ্যতামূলক করতে হবে। তথ্য মন্ত্রণালয় ও সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোকে স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে নিয়মিত তদারকি করতে হবে।

স্থানীয় সাংবাদিকরা যে রাষ্ট্রের অতন্দ্র প্রহরী- এনিয়ে কারোরই দ্বিমত থাকার কথা নয়। যারা প্রান্তিক জনপদের চোখ ও কানের ভূমিকা পালন করে, তাদেরকে বঞ্চিত রেখে একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম কাঠামো গড়ে তোলা অসম্ভব। তাই স্থানীয় সাংবাদিকদের লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে তাদের মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad