Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ২ ঘন্টা আগে
  • ১০ বার দেখা হয়েছে
ফটো কার্ড

মিরপুরে দখলমুক্ত ফুটপাতে পথচারীদের স্বস্তি

মিরপুরে দখলমুক্ত ফুটপাতে পথচারীদের স্বস্তি

অনলাইন ডেস্ক ►
পড়ন্ত বিকেলে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের ফুটপাত ধরে হাঁটছিলেন শরীফুল ইসলাম। দুই হাতে ধরা সন্তানদের ছোট্ট হাত। প্রায় ২০ বছর ধরে মিরপুরে বসবাস করলেও এমন মুহূর্ত তার জীবনে এটাই প্রথম। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এত বছরে কখনোই দুই সন্তানের হাত ধরে এই পথে হাঁটতে পারিনি, আজ পারছি। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’

শরীফুল ইসলামের এই স্বস্তির অনুভূতি এখন মিরপুরের হাজারো মানুষের। একসময় যে ফুটপাতে পা ফেলার জায়গা ছিল না, সেখানে এখন নির্বিঘ্নে হাঁটছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, চাকরিজীবী, বয়স্ক মানুষসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সড়ক ও ফুটপাত ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করছেন। গোলচত্বরের ফুটওভার ব্রিজের নিচের যে অংশ এতদিন অবৈধ দখলে ছিল, সেখানে গাছ লাগিয়ে পথচারীদের জন্য সুন্দর ও নান্দনিক পরিবেশের আবহ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে ডিএনসিসি। দোকানপাট আর ভিড়ের চিরচেনা দৃশ্য বদলে মিরপুর-১০ যেন এখন এক অচেনা নগরী।

কিছুদিন আগেও চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও হোপ স্কুল রোডে রাস্তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দখল করে গড়ে উঠেছিল অবৈধ ফুটপাত মার্কেট। বিশেষ করে হোপ স্কুল ও মিরপুর গার্লস আইডিয়াল স্কুলকে কেন্দ্র করে সামনের ফুটপাত ও সড়কজুড়ে বসতো সারি সারি দোকান, আর এসব দোকান থেকে ভেসে আসতো হকারদের উচ্চস্বরে হাঁকডাক, যা মিরপুরবাসীর অন্যতম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এসব দোকানের কারণে গোলচত্বর থেকে পূর্বদিকের তিনটি সড়কের মুখে সাধারণ মানুষ আর যানবাহনের ভিড় লেগে থাকতো। ফলে যানবাহন ও পথচারী উভয়কেই পোহাতে হতো নিয়মিত দুর্ভোগ।

মানুষের এই দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে গত ৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান চালায় ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ। এরপর থেকে মিরপুর-১০ ও হোপ স্কুলের সামনের অবৈধ ফুটপাত মার্কেট এখন পুরোপুরি ফাঁকা। এই উচ্ছেদ অভিযানে এলাকার সাধারণ মানুষ সিটি কর্পোরেশনের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে।

উচ্ছেদ অভিযানের পরবর্তী পরিকল্পনা জানতে চাইলে ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে বলেন, এই উদ্যোগ কেবল মিরপুরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, উত্তর সিটির প্রতিটি এলাকার ফুটপাত থেকে অবৈধ দোকানপাট দখলমুক্ত করা হবে। উচ্ছেদের পর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ পুনরায় দোকান বসিয়ে মানুষের চলাচলে বাধার সৃষ্টি করলে, তা কঠোর হাতে দমন করা হবে। এক্ষেত্রে জরিমানার পাশাপাশি দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, নগরবাসী যেন সুন্দর, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নিরাপদে পথ চলতে পারেন, সেজন্য আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা নেব। সড়ক ও ফুটপাত দখল করে যারা অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে নগরবাসীর ভোগান্তি বাড়াচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

এ সময় হকারদের পুনর্বাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জীবিকার জন্য হকারদের ব্যবসার সুযোগ অবশ্যই থাকবে, তবে তা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে নয়। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানেই তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। মানুষের চলাচলের পথ আর কারও দখলে ছেড়ে দেওয়া হবে না।

প্রশাসনের এই উদ্যোগের সুফল সবচেয়ে কাছ থেকে দেখছেন সড়কে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। মিরপুর-১০ নম্বরে দায়িত্ব পালন করা ট্রাফিক সার্জেন্ট আব্দুল আজিজ বাসস’কে বলেন, আগে মনে হতো যেন একটা বাজারের মাঝখান দিয়ে গাড়ি চলছে। ফুটপাত দখল থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতো, ফলে তীব্র যানজটও হতো। এখন রাস্তা অনেক ফাঁকা, যানজট তেমন নেই। রাস্তায় গাড়ি চলছে, ফুটপাতে মানুষ হাঁটছে। আমাদের কাজেও চাপ কমেছে।

ট্রাফিক পুলিশের এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত শিক্ষক সমাজও। ঢাকার নর্থ সিটি কলেজের প্রভাষক আবু বক্কর সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, একজন নাগরিক হিসেবে আমার চাওয়া ফুটপাত সবসময় থাকবে দখলমুক্ত, যাতে আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ও নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারি। এ সময় তিনি ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খানকে ধন্যবাদ জানান এবং পুরো সিটি কর্পোরেশন এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার দাবি জানান।

একই সুরে কথা বলেন মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটের এক শিক্ষক। তিনি বলেন, এটি আমাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল। আগে কেউ এই কাজ করতে পারেনি, বর্তমান সরকার করে দেখিয়েছে। আগে এই রাস্তা দিয়ে হাঁটলে নিজেকে মানুষ মনে হতো না। এখন কতটা ভালো লাগছে, তা বলে বোঝানো যাবে না।

শিক্ষকদের মতো স্বস্তি ফিরেছে শিক্ষার্থীদের মনেও। মিরপুরে বসবাসরত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শেখ অহোনা বাসসকে বলেন, প্রতিদিন মিরপুর-১০ থেকে মেট্রোরেলে ক্যাম্পাসে যাই। আগে বাসা থেকে বেরিয়ে দোকান আর ভিড় ঠেলে স্টেশনে পৌঁছাতেই অনেক সময় চলে যেত, প্রায়ই ক্লাসে দেরি হতো। এখন খোলা ফুটপাত ধরে কয়েক মিনিটেই স্টেশনে পৌঁছে যাই। সন্ধ্যায় ক্লাস শেষে ফেরার পথেও এখন নিশ্চিন্তে হাঁটতে পারি।

শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি নিশ্চিন্ত অভিভাবকরাও। মিরপুর গার্লস আইডিয়াল স্কুল থেকে সন্তানকে নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন এক মা। তিনি বলেন, এমন পরিবেশে আগে কখনো হাঁটা হয়নি। সন্তানকে নিয়ে এখন নিশ্চিন্তে হাঁটতে পারছি, খুব ভালো লাগছে।

ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় সুফল পাচ্ছেন স্থায়ী ব্যবসায়ীরাও। শাহ আলী প্লাজার বিক্রেতা শাহজাহান বাসসকে জানান, উচ্ছেদের পর রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়েছে। আগে যারা বাইরের ফুটপাত থেকে কেনাকাটা করতেন, তারা এখন মার্কেটে আসছেন। আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে এই মার্কেটে ব্যবসা করি, তাদের এখন বেচাকেনা বাড়ছে।

ব্যবসায়ীদের এই কথার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে মিরপুরের বাসিন্দা আনোয়ার জাহিদের কাছে। তিনি বলেন, আমি প্রায় ২৫ বছর ধরে মিরপুরে থাকি। একসময় এই রাস্তা খোলামেলাই ছিল। কিন্তু মাঝখানে এমন অবস্থা হয়েছিল যে ফুটপাত আর হাঁটার যোগ্য ছিল না। ফুটপাতের দোকানের কারণে মার্কেটের দোকানগুলোতেও বেচাকেনা কমে গিয়েছিল। আর এখন রাস্তাঘাট কত পরিচ্ছন্ন।

শুধু পথচারী বা ব্যবসায়ী নন, স্বস্তি পাচ্ছেন যানবাহনের চালকরাও। গাড়িচালক আমির বলেন, আগে মিরপুর-১০ থেকে বিআরটিএ পর্যন্ত গাড়ি নিয়ে যেতে অনেক সময় লাগতো, খুব কষ্ট হতো। আজ এক নিমিষেই এই সড়ক পার হয়ে এলাম।

সময় বাঁচার কথা বললেন পথচারী শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, আগে এই পথটুকু পার হতে প্রায় ২০ মিনিট লেগে যেত, এখন তিন-চার মিনিটেই পার হয়ে যাই। আমি চাই, পুরো ঢাকা শহর এমন সুন্দর ও নিরাপদ থাকুক।

নিরাপত্তার প্রসঙ্গ তুলে বেসরকারি ক্যাবল কোম্পানির এক কর্মী বাসসকে বলেন, আগে ভিড়ের মধ্যে এখানে পকেটমারের ভয় ছিল। এখন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছি।

আরেক পথচারী শফিক শাকিল বলেন, সকালে হাঁটতে বেরিয়ে দেখলাম, আগের মতো ফুটপাতজুড়ে আর দোকানের সারি নেই। পুরো পথটাই খোলা। সরকারের এমন উদ্যোগের প্রশংসা না করে পারছি না।

দখলমুক্ত ফুটপাতে স্বস্তির এই চিত্রে খুশি মিরপুরবাসী। তাদের প্রত্যাশা, মিরপুর-১০ নম্বরের মতো নগরীর প্রতিটি ফুটপাতই ফিরে যাবে পথচারীর কাছে, আর নগরবাসী পাবে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় চলাচলের পথ।
 

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad