Ad
  • মাধুকর প্রতিনিধি
  • ৫ ঘন্টা আগে

সংস্কৃতি: মানুষ টিকে থাকার সম্মিলিত শক্তি

সংস্কৃতি: মানুষ টিকে থাকার সম্মিলিত শক্তি

সংস্কৃতি: মানুষ টিকে থাকার সম্মিলিত শক্তি...

মানিক বাহার►

সংস্কৃতি শব্দটির বহু অর্থ রয়েছে। নৃতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান কিংবা সাহিত্যে এর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কিন্তু এই সময়ের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে সংস্কৃতিকে যদি একটি কেন্দ্রীয় অর্থে ধরতে হয়, তবে বলা যায় সংস্কৃতি হলো মানুষের সম্মিলিত শক্তি। একা মানুষ প্রকৃতির কাছে দুর্বল। একটি বাঘের সামনে একজন মানুষ শক্তিতে কিছুই নয়। এমনকি ক্ষুদ্র একটি তেলাপোকার কাছেও মানুষের টিকে থাকার ক্ষমতা সীমিত। ডাইনোসরের যুগ পেরিয়ে তেলাপোকা আজও বেঁচে আছে, কিন্তু সভ্যতা নির্মাণ করতে পারেনি। মানুষ পেরেছে। এই পার্থক্যের মূল কারণ মানুষের সংস্কৃতি।

মানুষের প্রকৃত শক্তি তার যূথবদ্ধতায়। সম্পর্ক, বোঝাপড়া, সহমর্মিতা এবং আলাদা থেকেও একাত্ম হওয়ার ক্ষমতাই মানুষকে শক্তিশালী করেছে। মানুষ ভিন্ন ভাষায় কথা বলে, ভিন্ন ভূগোলে বাস করে, ভিন্ন ধর্ম ও খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত তবু সে এক সমাজে মিলিত হয়ে থাকতে পারে। এই মিলনের নামই সংস্কৃতি। এই কারণেই একজন বাংলাদেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান কিংবা একজন ভারতীয় ধর্মপ্রাণ হিন্দু ভিন্ন জলবায়ু ও সংস্কৃতির দেশ ইউরোপ বা আমেরিকায় গিয়ে বসবাস করতে পারে, সে দেশের নাগরিক হতে পারে। কিন্তু আমাজনের জেব্রা বা আফ্রিকার জিরাফ সুন্দরবনে এসে সমাজ গড়ে তুলতে পারে না। প্রাণি সামাজিক হতে পারে, কিন্তু তারা সাংস্কৃতিক জীব নয়। তাদের কোনো সাংস্কৃতিক ভাষা নেই।

এই বাস্তবতার পর প্রশ্ন ওঠে মানুষ আসলে বাঁচে কেন? ক্ষমতার জন্য? টাকার জন্য? ইতিহাস আমাদের অন্য কথা বলে। আমরা দেখেছি ক্ষমতাবান মানুষ আত্মহত্যা করেছে, অঢেল সম্পদের অধিকারী মানুষও গভীর অসুখে ভুগেছে। অর্থাৎ ক্ষমতা কিংবা সম্পদ মানুষের বেঁচে থাকার আনন্দের নিশ্চয়তা নয়।

মানুষের আনন্দ জন্ম নেয় ছোট ছোট মুহূর্তে। গহিন নদীতে রাতের আকাশে থালার মতো চাঁদ দেখে একজন জেলে স্ত্রীর মুখ মনে করে সুখ পায়। একজন রাখাল সন্ধ্যার সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ গলা ছেড়ে গান ধরে। মুচি জুতো সেলাই করতে করতে গুনগুন করে। কৃষক সামান্য ঘটনাকে গল্প বানিয়ে বউকে শোনায়। কোনো বাবা ছোট্ট শিশুকে মিথ্যা বাঘের গল্প বলে। এসব মুহূর্তে রাষ্ট্র নেই, ক্ষমতার হিসাব নেই, ধর্মীয় বিভাজন নেই শুধু মানুষ আছে, আর মানুষের নির্মল আনন্দ।

মানুষ তখনই সবচেয়ে সুন্দর ও পবিত্র হয়ে ওঠে, যখন সে পাপ-পুণ্য, স্বর্গ-নরকের হিসাব ভুলে শিশুর মতো আনন্দে মেতে ওঠে। তখন সে একটি পিঁপড়েকেও আঘাত করে না, নিজেকে কোনো প্রাণীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে না। এই অবস্থাটিই সংস্কৃতির পরিশুদ্ধ রূপ। সংস্কৃতি এখানে কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয় এটি মানুষের মানবিক সত্তার স্বাভাবিক প্রকাশ।

মানুষ জন্মগতভাবেই সাংস্কৃতিক প্রাণী। সংস্কৃতি মানুষকে নতুন করে মানুষ বানায় না। কিন্তু সংস্কৃতিচর্চা প্রয়োজন হয়, যাতে এই স্বাভাবিক মানবিক ক্ষমতা ভোঁতা হয়ে না যায়। আদিম সমাজে সংস্কৃতিচর্চার জন্য আলাদা স্কুল বা মঞ্চের প্রয়োজন হয়নি। মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে বাস করেছে। সেখানে সংস্কৃতি ছিল জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহ।

কিন্তু আধুনিক নগরসভ্যতা, ভোগবাদী অর্থনীতি, বিভাজনমুখী জাতীয়তাবাদ ও ধর্মবাদী রাজনীতির মধ্যে মানুষ ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। মানুষ মানুষকে দেখছে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে, শত্রু হিসেবে। এই দূষিত বাস্তবতায় সংস্কৃতি হয়ে ওঠে এক ধরনের ফিল্টার। যেখানে দূষণ বেশি, সেখানে ফিল্টারের প্রয়োজনও বেশি। আজকের পৃথিবীতে সংস্কৃতি সেই ফিল্টার, যা মানুষকে আবার মানুষের সঙ্গে যুক্ত করে।

এই কারণেই সংস্কৃতিচর্চা শুধু গান, নাচ, অভিনয় বা উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সংস্কৃতি মানে শুধু মঞ্চ নয়,  পোশাক নয়, লোকজ আয়োজন নয়। মানুষ হিসেবে সংস্কৃতির বাইরে থাকা অসম্ভব। কারণ মানুষের পুরো অস্তিত্বটাই সংস্কৃতি দিয়ে গড়া। মানুষ সাংস্কৃতিক জীব।

মানুষ বেঁচে থাকুক খুব ছোট কিছুর জন্য একটি ফুলের জন্য, একটি প্রজাপতির জন্য, এক চিলতে হাসির জন্য, একলা পাখির গানের জন্য। কোনো রাষ্ট্রের জন্য নয়, কোনো যুদ্ধ জয়ের জন্য নয়, কোনো সাময়িক ক্ষমতার জন্য নয়। মানুষ বেঁচে থাকুক একটি মুহূর্তের জন্য যেখানে সে হিংসা ও বিদ্বেষ ভুলে, পাপ-পুণ্যের ঊর্ধ্বে উঠে, বৃক্ষের মতো নীরব ও নির্মল হয়ে পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। এই নির্মল অবস্থাটিই মানুষকে মানুষ করে। এই অবস্থাটির নামই সংস্কৃতি।

লেখক: সাংস্কৃতিক কর্মী

নিউজটি শেয়ার করুন

Ad

এ জাতীয় আরো খবর
Ad
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Ad