- মাধুকর প্রতিনিধি
- তারিখঃ ২৯-৩-২০২৬, সময়ঃ বিকাল ০৪:৪৭
চরাঞ্চলে জীবন-জীবিকায় প্রতিনিয়তই যুদ্ধ
মজিবুল হক ছানা ►
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা বেষ্টিত ১৬৫টি চরাঞ্চলে প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষের বেড়ে ওঠা, জীবন-জীবিকা প্রতিনিয়তই সংগ্রাম ও যুদ্ধ করে প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। “স্বাদে ভরা রসমঞ্জুরীর ঘ্রাণ, চরাঞ্চলের ভুট্টা মরিচ গাইবান্ধার প্রাণ” এই স্লোগানেই গাইবান্ধা জেলা পরিচিতি পেলেও উন্নয়নের মানচিত্রে বারবার পিছিয়ে পড়ে চরাঞ্চলের মানুষ। বন্যা আর নদী ভাঙ্গনের মাঝেও জেলার চরাঞ্চল জুড়ে লুকিয়ে আছে কৃষি পর্যটন ও বিপুল সম্ভাবনা যার সঠিক বিকাশ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও আজও বিকাশ ঘটেনি অবহেলিত রয়েছে এ অঞ্চলের মানুষেরা।
গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের মানুষের জীবন এখনো রয়ে গেছে অনুন্নয়নের অন্ধকারে। আধুনিকতার ছোঁয়া এখানে যেন পৌঁছায়নি। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জরুরি চিকিৎসা, সব ক্ষেত্রেই প্রতিদিন লড়াই করতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। বর্ষা এলেই চারপাশের জনপদ নদীর পানিতে তলিয়ে গিয়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। নৌকা ছাড়া চলাচলের কোনো উপায় থাকে না। শিশুরা স্কুলে যেতে পারে না এমনকি অনেক সময় মাঝরাতে রোগী অসুস্থ হলে নৌকা জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে। আর অন্যদিকে শুকনো মৌসুমে সেই নদীই পরিণত হয় শুধু ধুধু বালুচরে। কয়েক কিলোমিটার বালুর উপর দিয়ে হেঁটে রোগী বহন করা যেন এক নির্মম বাস্তবতা।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে জরুরি মুহূর্তে হাসপাতালে নেওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অনেক নারী রোগীকে খাটিয়া বা বাঁশের “চলচকি”তে করে বহন করা হয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক সময় রাস্তাতেই প্রসব বেদনা শুরু হয়। কেউ কেউ পথেই সন্তান প্রসব করেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে জটিলতার কারণে গর্ভপাত বা মায়ের জীবনহানির মতো মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। শুধু গর্ভবতী নারীই নয়, সাধারণ রোগীরাও একই দুর্ভোগে পড়েন। সাপের কামড়, জ্বর, দুর্ঘটনা বা হঠাৎ অসুস্থতা-যে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় বাড়ছে মৃত্যুর ঝুঁকি। অনেকে অর্থাভাবে দূরের হাসপাতালে যেতে পারেন না, আবার অনেক সময় পথের কষ্ট সহ্য করতে না এমন পরিস্থিতিতে মাঝপথেই বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হয়।
এছাড়া চরাঞ্চলে নৌকায় চড়ে সহজেই হাটে ঘাটে শহরে যাওয়া আসা করা যায়, কিন্তু বয়স্ক ও শিশুদের জন্য দুই থেকে তিন কিলোমিটার বালুচর হেঁটে পারাপার হতে মাঝে মধ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নদীতে পানি থাকলে নৌকার মাঝি ও শ্রমজীবী মানুষেরা নদী পারাপার করে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, আমরা যেন এই দেশের নাগরিক হয়েও আলাদা এক পৃথিবীতে বাস করি। অসুখ হলে ভাগ্যের উপরই ভরসা করতে হয়। এদিকে অনেক চর এলাকায় এখনো নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স বা কার্যকর কমিউনিটি ক্লিনিক। যেগুলো আছে, সেগুলোতেও প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। বিদ্যুৎ, পরিষ্কার পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাও অনেক জায়গায় অপ্রতুল, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চরাঞ্চলের এই দীর্ঘদিনের অবহেলা দূর করতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত ধাত্রী, মোবাইল মেডিকেল টিম, নৌ-অ্যাম্বুলেন্স এবং টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা-স্বাধীনতার এত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও জীবনের সঙ্গে প্রতিনিয়তই সংগ্রাম ও যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার পরিসমাপ্তি ঘটেনি। সাবেক জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যাশা নতুন সরকারের পথ পরিক্রমায় চরাঞ্চলের মানুষেরা আর অবহেলিত ও বঞ্চনার শিকার হয়ে থাকবে না।