- মাধুকর প্রতিনিধি
- এই মাত্র
রাজশাহী থেকে যেভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লো হাম
অনলাইন ডেস্ক ►
দেশে হাম ও উপসর্গে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। এ নিয়ে রোগীর অভিভাবক ও স্বজনদের আহাজারির শেষ নেই। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হাম ও উপসর্গের মৃত্যুর খবর আসে প্রথম। এরপর থেকে দেশের অন্য জেলা থেকেও হাম ও উপসর্গের মৃত্যুর খবর আসতে থাকে। ছড়িয়ে পড়ে প্রায় সব জেলায়। ইতিমধ্যে ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে মৃত্যু। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে কীভাবে এত দ্রুত সারা দেশে এই রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লো। কেন প্রতিরোধ করা গেলো না।
হামের সূত্রপাত
চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি সময়ে রাজশাহী বিভাগে প্রথম এই ভাইরাসের তীব্র প্রাদুর্ভাব ধরা পড়ে, যা পরবর্তীতে প্রায় ৫৮টি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে এর সূত্রপাত হয়েছিল চলতি বছরের জানুয়ারিতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে প্রথমবারের মতো হাম শনাক্ত হয়েছিল ৪ জানুয়ারি। আর মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে রাজশাহী অঞ্চলে হাম রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি জানা যায় এবং ১৮ মার্চের মধ্যে ৪৪ জনের শরীরে সংক্রমণ নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য বিভাগ।
দ্রুত সংক্রমণের কারণগুলো কী
অপর্যাপ্ত টিকাদান এবং জনবহুল পরিবেশের কারণে অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই সংক্রমণটি পরবর্তীতে সারা দেশে মহামারির রূপ নেয়, যার ফলে দেশের সিংহভাগ জেলায় হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। হামের প্রাদুর্ভাব এবং সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে মূলত টিকাদানের ঘাটতি এবং হাসপাতালের অভ্যন্তরে হওয়া সংক্রমণ এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানাকে দায়ী করছেন চিকিৎসকরা। এ ছাড়া আরও কিছু কারণ রয়েছে বলেও জানান তারা।
টিকাদানের বড় ধরনের ঘাটতি ও ক্যাম্পেইন স্থগিত হওয়া
সাধারণত প্রতি ৫ বছর পর পর দেশে বড় পরিসরে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন করা হয়। তবে ২০২৫ সালে নির্ধারিত এই বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইনটি অনুষ্ঠিত না হওয়ায় শিশুদের মধ্যে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার একটি বড় ঘাটতি তৈরি হয়।
টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে হামের প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ কমে যাওয়ায় প্রায় ২ থেকে ৩ কোটি শিশু এই ভাইরাসের ঝুঁকিতে রয়ে যায়। রাজশাহীতে আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশই ছিল ৬ থেকে ৯ মাসের, যাদের নিয়মিত সূচি অনুযায়ী তখনও হামের প্রথম ডোজ দেওয়ার বয়সই হয়নি।
হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণ
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে অন্যান্য সাধারণ রোগের চিকিৎসা নিতে আসা শিশুরা সেখানে চিকিৎসাধীন হাম আক্রান্ত শিশুদের সংস্পর্শে এসে সংক্রমিত হতে শুরু করে।
হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন ওয়ার্ডের সীমাবদ্ধতা এবং ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় অত্যন্ত ছোঁয়াচে এই ভাইরাসটি এক শিশু থেকে অন্য শিশুর শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
হাসপাতাল থেকে যেভাবে ছড়ালো গ্রামে
পরবর্তীতে আক্রান্ত শিশুরা সুস্থ হয়ে বা আংশিক সুস্থ অবস্থায় নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেলে সংক্রমণ প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি ভাইরাসের উচ্চ সংক্রমণশীলতা ও অসচেতনতাবাতাসের মাধ্যমে দ্রুত বিস্তার করে। হাম একটি চরম ছোঁয়াচে বায়ুবাহিত রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি বা শ্বাসনালীর নিঃসরণের মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।
ভুল ধারণা ও উপসর্গ গোপন
গ্রামীণ জনপদে অনেক অভিভাবক হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে সাধারণ জ্বর বা অ্যালার্জি মনে করে অবহেলা করেছেন। সঠিক সময়ে আইসোলেশন বা আলাদা না রাখার কারণে আক্রান্ত শিশুদের মাধ্যমে তাদের পরিবার, প্রতিবেশী এবং স্থানীয় স্কুল বা খেলার সাথীদের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে।
ভৌগোলিক যোগাযোগ ও গণপরিবহনের মাধ্যমেও ছড়িয়েছে
রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় দ্রুত সংক্রমণ ছড়ানোর পর, সাধারণ মানুষের অবাধ যাতায়াত এবং গণপরিবহন ব্যবহারের মাধ্যমে এটি ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনা বিভাগেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাদুর্ভাবের পরবর্তী ধাপগুলোতে সবচেয়ে বেশি রোগীর চাপ তৈরি হয় ঢাকা বিভাগে। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফের সহায়তায় স্বাস্থ্য অধিদফতর টিকাদান জোরদার করা এবং নতুন করে বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে।
চিকিৎসা পেতে ভোগান্তি
১৯ মে বিকালে রামেক হাসপাতালে ভেতরের খবরের অনুমতি না পেয়ে বাইরে থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া একজন রোগীর অভিভাবক রোজিনা খাতুনকে পাওয়া গেলো। তিনি এসেছেন নাটোর জেলার লালপুর এলাকা থেকে। চিকিৎসা পেতে ভোগান্তির কথা জানিয়ে রোজিনা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার মেয়েটার প্রথমে ঠান্ডা-জ্বর ছিল। আমরা সাধারণ জ্বর মনে করেছিলাম। পরে গায়ে ছোট ছোট লাল দানা উঠলে হাসপাতালে নিয়ে আসি। ডাক্তার জানান এটি হাম। হাসপাতালে এসে দেখি অনেক শিশুই একই সমস্যায় ভর্তি আছে। রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় চিকিৎসকরা খুব ব্যস্ত থাকেন। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে শিশুকে নিয়ে রাতে হাসপাতালে থাকা। বাচ্চা ঠিকমতো খেতে পারছে না, সারাক্ষণ কান্না করছে।’
বাইরে আরেকজন রোগীর স্বজনের সঙ্গে কথা হয়। চারঘাট উপজেলার সেতারা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার বাচ্চার কয়েকদিন ধরে জ্বর ছিল। পরে দেখি গায়ে লাল দানা এবং কাশি। তখন হাসপাতালে নিয়ে আসি। ডাক্তার বলেছেন এটা হাম। হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় কষ্ট হচ্ছে। বেড পেতে সময় লেগেছে। ছোট বাচ্চা হওয়ায় সারাক্ষণ ভয় কাজ করছে। আমার মনে হয় শিশুদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা আরও বাড়ানো দরকার। অনেক সময় ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে, যা আমাদের জন্য কষ্টকর।’
হাসপাতাল থেকেও সংক্রমণ ছড়িয়েছে
চলতি বছরের মার্চ মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা অভিভাবক সাজিয়া আক্তার বলেন, ‘ছয় বছর বয়সী শিশু শহীদকে নিউমোনিয়া নিয়ে রোজা ঈদের আগে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তখন তার শরীরে হামের লক্ষণ ছিল না। হামের রোগীর পাশেই তাকে রাখা হয়েছিল, সেখান থেকেই আক্রান্ত হয়েছে। চিকিৎসকরা আলাদা রাখতে বললেও অনেক অভিভাবক নিয়ম মানেনি। এতে আমার বাচ্চার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়, কয়েক দিন আইসিইউতেও রাখতে হয়েছে। এতে করে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অন্য রোগীর সংস্পর্শে এসে আমার ছেলে হামে আক্রান্ত হয়। এভাবে আরও অনেক শিশু আক্রান্ত হয়।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসন সংখ্যার তুলনায় রোগী থাকে প্রায় তিন গুণ। অনেক রোগীকে মেঝেতে থাকতে হয়, আবার ওয়ার্ডের ভেতরের মতো বারান্দাও রোগীতে পূর্ণ। সবচেয়ে বেশি ভিড় শিশু বিভাগে। সেখানে একেকটি বেডে তিন-চার জন, কখনও তারও বেশি রোগীকে রাখা হয়। এমন ঘিঞ্জি পরিবেশে এক রোগীর থেকে অন্য রোগীর মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছিল। এভাবেই অনেক শিশুর মধ্যে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। যা পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
মার্চের শুরুতে ঠান্ডা ও জ্বর নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশু সিফাতের বাবা সাদিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে, ‘নিউমোনিয়া নিয়ে ভর্তি করেছিলাম শিশুকে। কিন্তু অন্য বাচ্চাদের সংস্পর্শে এসে হামে আক্রান্ত হয়। এরপর হামের বিস্তার বাড়তে থাকায় রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বিশেষ ওয়ার্ড খোলা হয়েছিল। ততদিনে কমবেশি হাসপাতালে থাকা সব শিশু আক্রান্ত হয়। এতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।’
মানা হয়নি নির্দেশনা
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাম অত্যন্ত সংক্রামক। এই রোগের বিস্তার রোধে আমরা কাজ করছি। সংক্রমণের শুরু থেকে আলাদা ওয়ার্ডে রেখে হামের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। অনেকে তা মানেনি।’
তবে রামেক হাসপাতালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও পাবনা থেকে আসা রোগীদের হামের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালের অতিরিক্ত রোগীর চাপ, অপর্যাপ্ত আইসোলেশন ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যবিধি ঠিকমতো না মানার কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছিল।
জবাব নেই রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দায়িত্বশীলদের
হামে আক্রান্তদের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাসকে এই প্রতিবেদক তিনবার কল দিয়েছেন। কিন্তু রিসিভ করেননি। এমনকি মেসেজ দিলেও সাড়াও দেননি। ১৯ মে বিকাল সাড়ে ৪টার সময় সরেজমিনে প্রতিবেদন করার জন্য গেলেও হাসপাতালের ৩০-বি ওয়ার্ডে কর্মরত চিকিৎসক ও নার্সরা শংকর (রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস) স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। কিন্তু তাকে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সাড়া মেলেনি।
২২ মে রাত ৮টা ১১ মিনিটে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলামকে কল দিলে তিনি রিসিভ করেন। রাজশাহী থেকে হাম কীভাবে ছড়িয়ে পড়লো সারা দেশে এমন প্রশ্ন করতেই কল কেটে দেন। তাই রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনও জবাব মেলেনি।
রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এই হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে চার জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। আর ছাড়পাত্র পেয়েছেন ১৩ জন। ২৪ ঘণ্টায় কোনও মৃত্যু নেই এই হাসপাতালে। তবে বর্তমানে ৭১ জন রোগী হাম উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
খবর-বাংলা ট্রিবিউন