• মাধুকর প্রতিনিধি
  • এই মাত্র

সাহিত্যচর্চা নাকি লেখক-উৎপাদনের মহামারী : সাহিত্যাঙ্গনে শব্দ, সাধনা ও সিন্ডিকেটের টানাপোড়েন



কায়সার রহমান রোমেল►

সাহিত্য কি সবার জন্য উন্মুক্ত চর্চার ক্ষেত্র, নাকি এটি কেবল নির্বাচিত কয়েকজনের একচেটিয়া এলাকা? আবার উল্টো প্রশ্নও উঠে আসে —যা খুশি লিখলেই কি লেখক হওয়া যায়? সাম্প্রতিক সময়ে গাইবান্ধার সাহিত্যাঙ্গনকে ঘিরে এই দ্বন্দ্বই সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। একদিকে লেখক হওয়ার প্রবল আকাঙ্খা, অন্যদিকে মান, সাধনা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন। এই টানাপোড়েনের ভেতর দিয়েই আজকের সাহিত্যচর্চার বাস্তব চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সাহিত্য মূলত দীর্ঘ সাধনার ফল। ভাষা আয়ত্ত করা, পাঠের গভীরতা, অভিজ্ঞতার পরিপক্বতা, আত্মসমালোচনা ও সময়—এই সবকিছুর ভেতর দিয়েই একজন লেখক ধীরে ধীরে তৈরি হন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই কঠিন পথ এড়িয়ে অনেকেই খুব দ্রুত ‘লেখক’ পরিচয়ে পৌঁছাতে চান। শব্দ ও চিন্তার প্রস্তুতি ছাড়াই কলম ধরছেন কেউ কেউ। ফল হিসেবে তৈরি হচ্ছে এমন এক ধরনের লেখা, যেখানে শব্দ আছে, কিন্তু অর্থ নেই; বাক্য আছে, কিন্তু ভাবনা অনুপস্থিত।

এই প্রবণতাকে কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে ‘শব্দদৈন্যবাদ’ বলে আখ্যা দেন। কঠিন শব্দের আড়ালে ভাবনার দৈন্য ঢেকে রাখার এক ধরনের কৌশল যেন এটি। সহজ কথাকে জটিল করে বললেই লেখা গভীর হয়ে যায়—এমন এক ভ্রান্ত ধারণা অনেকের মধ্যে কাজ করছে। অথচ সাহিত্য পাঠকের কাছে কঠিন হওয়া মানেই গভীর হওয়া নয় বরং স্পষ্ট ভাষায় জটিল সত্য বলাই সাহিত্যের বড় শক্তি।

এখানেই প্রশ্ন ওঠে—তাহলে কি নতুন বা শখের লেখকদের নিরুৎসাহিত করা উচিত? উত্তরটা একরৈখিক নয়। লেখালেখির শুরুতে প্রায় সবার লেখাই কাঁচা থাকে—এটাই স্বাভাবিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রাথমিক লেখাগুলোও সাধনার ভেতর দিয়েই পরিণত হয়েছে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি গল্পই তাঁকে পরিচিত করে তুলেছিল আর টলস্টয়ের লেখার পেছনে ছিল অসংখ্য কাটাছেঁড়া। অর্থাৎ, লেখা জন্ম নেয় চর্চার মধ্য দিয়েই। কিন্তু চর্চার নামে যদি দুর্বলতাকে প্রশ্নহীনভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে সেই চর্চাই একসময় স্থবির হয়ে পড়ে।

সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন উৎসাহ আর অন্ধ প্রশংসা একাকার হয়ে যায়। গঠনমূলক সমালোচনার জায়গায় যদি কেবল বাহবা থাকে, তাহলে লেখক নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝবেন কীভাবে? আবার সমালোচনার নামে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অপমানও সমান ক্ষতিকর। সমালোচনা আর অপমান এক জিনিস নয়। সাহিত্য বিকশিত হয় সেই পরিবেশে, যেখানে প্রশ্ন করা যায়, ভিন্নমত প্রকাশ করা যায়, আবার শেখার সুযোগও থাকে।

এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বাস্তবতা—প্রকাশনা ও সংগঠনকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চা। আজকাল অর্থ থাকলেই বই প্রকাশ কঠিন নয়। এতে লেখকের স্বপ্ন পূরণ হয়, প্রকাশকের লাভ হয় কিন্তু পাঠক প্রায়ই বিভ্রান্ত হন। বইয়ের মোড়ক ঝকঝকে, প্রকাশনা অনুষ্ঠান জমকালো—কিন্তু ভেতরের লেখা অনেক সময়ই প্রশ্ন তোলে না, ভাবায় না।

একইভাবে গড়ে উঠছে সংগঠননির্ভর এক ধরনের সাহিত্য-সিন্ডিকেট। যোগ্যতা বা সৃষ্টিশীলতায় জায়গা না পেয়ে কেউ কেউ নিজেরাই খুলে বসছেন সাহিত্য সংগঠন। সেই সংগঠনের সভাপতি, সম্পাদক, প্রধান আলোচক—সবই তিনি নিজেই। আবার একই মুখ দেখা যায় একাধিক সংগঠনের মঞ্চে। এতে তৈরি হয় এক ধরনের চক্র, যেখানে পারস্পরিক প্রশংসাই প্রধান যোগ্যতা। নতুন বা প্রকৃত প্রতিভাবান লেখকদের জন্য এই বৃত্ত ভেদ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘পীর-মুরিদ’ সংস্কৃতি। কেউ কেউ নিজেকে সাহিত্যাঙ্গনের অভিভাবক হিসেবে দাঁড় করান। তাঁদের চারপাশে তৈরি হয় অনুগত অনুসারীদের বলয়। এখানে ভালো লেখা নয়, আনুগত্যই হয়ে ওঠে মূল্যায়নের মানদণ্ড। প্রশ্ন বা সমালোচনা মানেই অবজ্ঞা। এই পরিবেশে সাহিত্য তার প্রাণশক্তি—স্বাধীন চিন্তা ও বিতর্ক —ধীরে ধীরে হারাতে থাকে।

তবু এত হতাশার মাঝেও একটি সত্য অস্বীকার করা যায় না—সাহিত্য পুরোপুরি ধ্বংস হয় না। ভালো লেখা সব সময়ই কোনো না কোনো প্রান্তে তৈরি হয়। ইতিহাস বলে, প্রকৃত সাহিত্য কখনোই শুধু সংগঠন বা মঞ্চনির্ভর ছিল না। অনেক বড় লেখকই প্রতিষ্ঠানের বাইরে, নীরবে নিজেদের কাজ করে গেছেন। সময়ই শেষ পর্যন্ত ঠিক করে দেয়—কে টিকে থাকবে আর কে ঝরে পড়বে।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ তাই একটাই—লেখাকে আবার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা। পদ-পদবি, সংগঠন বা সম্মাননা নয়—পাঠ, সাধনা ও দায়বদ্ধতাই হোক মুখ্য। সমালোচনাকে শত্রুতা না ভেবে শেখার শর্ত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আর পাঠকদেরও দায়িত্ব আছে—ভিড়ের বাহবা নয়, লেখার মান দিয়ে বিচার করার।

সাহিত্য কোনো ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য নয় আবার যা খুশি লেখার অবাধ লাইসেন্সও নয়। সাহিত্য টিকে থাকে সত্য অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে। সিন্ডিকেট ভেঙে যায়, প্রচার ফুরিয়ে যায়—কিন্তু ভালো লেখা থেকে যায়। শেষ বিচারে সময়ই সবচেয়ে ন্যায়বান সমালোচক।

এই আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পাঠক-সংকট। সাহিত্যচর্চা দুর্বল হয়ে পড়ার দায় কেবল লেখক বা সংগঠনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে পুরো চিত্রটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাস্তবতা হলো—আমরা অনেকেই আর পড়তে চাই না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাড়াহুড়ো, ক্ষণস্থায়ী মনোযোগ আর ‘ভাইরাল’-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি গভীর পাঠের অভ্যাসকে ক্রমশ ক্ষয় করে দিচ্ছে। পাঠক যখন ধৈর্য হারায়, তখন লেখাও স্বাভাবিকভাবেই দ্রুত ও হালকা হয়ে ওঠে। ফলে গভীর সাহিত্য ও গভীর পাঠ—দুটোই একে অপরের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

এখানে সমালোচকের ভূমিকার কথাও নতুন করে ভাবা দরকার। আমাদের সাহিত্যাঙ্গনে প্রকৃত সমালোচক প্রায় অনুপস্থিত। কেউ কেউ প্রশংসাকারী হয়ে উঠেছেন, কেউ আবার ব্যক্তিগত বিরোধ মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে সমালোচনাকে ব্যবহার করছেন। অথচ সমালোচকের কাজ হওয়া উচিত লেখার শক্তি ও সীমাবদ্ধতা দুটোই চিহ্নিত করা —ব্যক্তিকে নয়, পাঠ্যকে সামনে রেখে। সুস্থ সমালোচনার পরিবেশ না থাকলে সাহিত্যচর্চা ভারসাম্য হারায়, আর সেই শূন্যস্থান দখল করে নেয় গোষ্ঠীস্বার্থ ও তোষামোদ।

নতুন লেখকদের ক্ষেত্রেও এই ভারসাম্য সবচেয়ে জরুরি। তাদের লিখতে দিতে হবে, ভুল করতে দিতে হবে, আবার সেই ভুলের জায়গাগুলো স্পষ্ট করে দেখিয়েও দিতে হবে। অনুপ্রেরণা মানে অন্ধ বাহবা নয়; অনুপ্রেরণা মানে পথ দেখানো। কেউ যদি শুরুতেই ‘লেখক’ উপাধি পেয়ে যান, তবে শেখার তাগিদ অনেক সময়ই কমে যায়। আবার নির্মম আচরণে যদি কেউ লেখালেখি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, সেটাও সাহিত্যক্ষেত্রের ক্ষতি। এই দুই প্রান্তের মাঝখানেই সুস্থ সাহিত্যচর্চার জায়গা।

একই সঙ্গে লেখকদেরও নিজেদের কাছে কিছু প্রশ্ন রাখা দরকার—আমি কেন লিখছি? পরিচয়ের জন্য, না ভাবনার জন্য? পাঠককে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাতে, না শুধু বাহবা কুড়াতে? এই আত্মজিজ্ঞাসাই লেখাকে পরিণত করে। লেখক যখন নিজের লেখা নিয়ে নিজেই কঠোর হন, তখন বাইরের সমালোচনাও আর শত্রু মনে হয় না বরং তা হয়ে ওঠে সহযাত্রী।

সবশেষে বলতে হয়, সাহিত্য কোনো ত্বরিত সাফল্যের প্রকল্প নয়। এটি দীর্ঘ শ্বাসের কাজ। এখানে কেউ ধীরে এগোয়, কেউ ঝরে পড়ে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই প্রক্রিয়াকে যদি সিন্ডিকেট, ক্ষমতা প্রদর্শন আর ভণ্ডামি গ্রাস করে, তাহলে ক্ষতিটা ব্যক্তির নয়, সমগ্র সাহিত্যপরিসরের। তাই আজ সবচেয়ে জরুরি হলো —লেখা, পাঠ ও সমালোচনার একটি সৎ ও স্বচ্ছ পরিবেশ তৈরি করা।

কারণ শেষ পর্যন্ত সাহিত্য বাঁচে কোনো সংগঠনের নামফলকে নয়, বাঁচে পাঠকের মনে। সময়ের আদালতে পদ-পদবি, প্রচার কিংবা কৃত্রিম গুরুত্ব টেকে না—টিকে থাকে কেবল সেই লেখা, যা মানুষকে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায় আর নিজের ভেতরের সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সময়ই শেষ বিচারক —এবং সেই বিচারে ভালো সাহিত্যই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়।

কায়সার রহমান রোমেল, লেখক-সাংবাদিক