- মাধুকর প্রতিনিধি
- তারিখঃ ১৮-১-২০২৬, সময়ঃ রাত ০৮:০৯
৭৪ বছর বয়সেও রিকশার প্যাডেলে জীবন টেনে নিচ্ছেন মকবুল হোসেন
আমিনুল হক, ফুলছড়ি►
মানুষের জীবনে বয়স একসময় থমকে দাঁড়ায়, কিন্তু জীবন সংগ্রাম থামে না। গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার এক কোণে প্রতিদিন এই কঠিন বাস্তবতার প্রমাণ দিয়ে রিকশার প্যাডেল ঘুরিয়ে চলেছেন ৭৪ বছর বয়সী বৃদ্ধ মকবুল হোসেন। কুঁচকানো চামড়ার ভাঁজে লুকিয়ে থাকা এই মানুষটির পরিচয় কেবল একজন রিকশাচালক হিসেবে নয় বরং এক দুর্ভাগা শিক্ষিত লড়াকু হিসেবে।
মকবুল হোসেন ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের কেতকিরহাট এলাকার মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে। সত্তরের উত্তাল সময়ে ১৯৭০ সালে তিনি মেট্রিক এবং ১৯৭২ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সরকারি চাকরি করবেন, পরিবারের অভাব ঘুচিয়ে আনবেন স্বচ্ছলতা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই স্বপ্ন আজ রিকশার চাকায় পিষ্ট। আশির দশকে ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ ভাঙনে নিজের শেষ সম্বল ঘরবাড়ি ও জমিজমা সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে মকবুল হোসেনের পরিবার। ভিটেমাটি হারিয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে তিনি আশ্রয় নেন উদাখালী ইউনিয়নের পূর্ব ছালুয়া গ্রামে। সেখানে কোনো স্থায়ী কাজ বা কর্মসংস্থানের সুযোগ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত রিকশার হ্যান্ডেলকেই বেছে নেন জীবিকার একমাত্র ভরসা হিসেবে।
বর্তমানে বয়সের ভারে শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না। সামান্য হাঁটতেই হাঁপিয়ে ওঠেন, তবুও পেটের দায়ে প্রতিদিন রাস্তায় নামতে হয়। দিনের আলোয় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাপটে সাধারণ রিকশার যাত্রী মেলা ভার। তাই সন্ধ্যা নামলেই তাঁকে দেখা যায় কালিরবাজার বটতলা এলাকায়। রাতের অন্ধকারে যাত্রী খুঁজে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনো রকমে চলে তাঁর জীবন। মকবুল হোসেনের জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্টের নাম অভাব নয়, বরং একাকিত্ব। তাঁর তিন ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে। ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। জীবিকার তাগিদে তিন ছেলেই এলাকার বাহিরে থাকেন। স্ত্রী মনোয়ার বেগম দুই বছর আগে প্যারালাইসে আক্রান্ত হয়ে হাত-পা অবস হওয়ার পর থেকে বড় মেয়ের বাড়িতে থাকেন।
নিভে আসা চোখে শূন্যতা নিয়ে মকবুল হোসেন বলেন, ‘শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে ঠিকই, কিন্তু ভাগ্য সবসময় বদলায় না। আয় না হলে তো পেটে ভাত জোটে না। ভিক্ষা করতে পারি না, তাই এই বয়সেও প্যাডেল ঘুরাই।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মকবুল হোসেনের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বর্তমান দুরবস্থার কথা জানলে মন ভারী হয়ে ওঠে। তাঁরা মনে করেন, সরকারি বা বেসরকারিভাবে যদি এই বৃদ্ধের জন্য একটু সাহায্যের হাত বাড়ানো হতো, তবে শেষ বয়সে তিনি অন্তত একটু বিশ্রাম পেতেন।
মকবুল হোসেনের এই জীবনগল্প কেবল একজন রিকশাচালকের সংগ্রাম নয়, এটি নদীভাঙনের নিষ্ঠুর বাস্তবতা এবং আমাদের সমাজের পারিবারিক ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। তিনি কারো করুণা চান না, কেবল চান একটু মর্যাদা ও শেষ বয়সের নিরাপদ আশ্রয়। আমাদের সমাজ ও প্রশাসন কি পারবে এই সংগ্রামী বৃদ্ধের পাশে দাঁড়াতে?