- মাধুকর প্রতিনিধি
- এই মাত্র
রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার পদে আলোচনায় যারা
অনলাইন ডেস্ক ►
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে যাচ্ছে আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। সংসদ সচিবালয় ও সরকারদলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথম সংসদ অধিবেশন শুরু হতে পারে ক্ষমতাসীন দলের সিনিয়র কোনো এমপির সভাপতিত্বে। এ অধিবেশনেই নির্ধারণ করা হবে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার। এর আগে সংসদের উপনেতা, চিফ হুইপ ও চারজন হুইপ নির্ধারণ করতে পারে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী দল বিএনপি।
এদিকে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আদৌ পদত্যাগ করছেন কিনা এবং কে হতে যাচ্ছেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি- এমন প্রশ্নও ঘুরছে রাজনৈতিক মহলে। এ ক্ষেত্রে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন- ড. আবদুল মঈন খান। তার বাইরে অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনূস এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামও বিভিন্ন মহলের আলোচনায় রয়েছে।
অন্যদিকে কে হচ্ছেন নতুন সংসদের স্পিকার, উপনেতা, চিফ হুইপ- এ নিয়েও রয়েছে নানারকম আলোচনা। বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, স্পিকার পদে জোর আলোচনায় রয়েছেন বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। এ ছাড়া ডেপুটি স্পিকার হিসেবে ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ ও আশরাফ উদ্দিন নিজানের নাম আলোচনায় রয়েছে।
এদিকে জুলাই সনদ অনুযায়ী বিরোধীদল থেকে ডেপুটি স্পিকার করা হলে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন ও আহমাদ বিন কাশেম আরমানের নাম শোনা যাচ্ছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী বিএনপির সংসদ সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তাদের সংসদ নেতা নির্বাচিত করেছেন। তবে উপনেতা ও চিফ হুইপ এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। অন্যদিকে বিরোধী জোটের সংসদীয় দল এরই মধ্যে বিরোধীদলীয় নেতা, উপনেতা ও চিফ হুইপ মনোনীত করেছে।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সংসদ উপনেতা হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও ভাইস চেয়ারম্যান ড. ওসমান ফারুক।
এ ছাড়া চিফ হুইপ হিসেবে সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট জয়নুল আবদীন ফারুক ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলুর নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে সংসদ উপনেতা কিছুদিন পর নির্ধারণের আইনি সুযোগ রয়েছে। তবে অধিবেশন শুরুর আগেই চিফ হুইপ ও চার হুইপ নির্বাচন করা হতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আগামী ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে পারে। এর দুয়েক দিন আগেও হতে পারে।
সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা বলেন, শপথগ্রহণের এক মাসের মধ্যে সংসদ অধিবেশন বসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে অধিবেশন বসার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আমরা পাইনি।
সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের সরকারি গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। অধিবেশনটি ডাকবেন রাষ্ট্রপতি, তবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী তা করেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল সরকারিভাবে প্রকাশ হয় ১৩ ফেব্রুয়ারি। সেই হিসাবে আগামী ১৫ মার্চের মধ্যে প্রথম অধিবেশনে বসতে হবে। সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে অর্থাৎ ১০ থেকে ১২ মার্চের যে কোনো এক দিন প্রথম অধিবেশন শুরু হতে পারে।
এদিকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে অধিবেশনের প্রথম দিনের বৈঠকে কে সভাপতিত্ব করবেন- এ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তীকালে পদত্যাগ করেন দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। এ ছাড়া তৎকালের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু আছেন কারাগারে। ফলে এবার সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে অধিবেশনের সভাপতিত্বের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। তবে স্বাধীনতার পরে প্রথম সংসদে জ্যেষ্ঠ সদস্যকে দায়িত্ব দিয়ে স্পিকার নির্বাচনের নজির রয়েছে। এবারও সেই পদ্ধতি অনুসরণ করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
আইন অনুযায়ী, সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন ও শোক প্রভাব গ্রহণ করা হবে। বিধান অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হবে।
এ ছাড়া নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন। এর আগে সেই ভাষণ মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করা হবে এবং অধিবেশনজুড়ে সদস্যরা ভাষণের ওপর আলোচনা করবেন।
শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে গত বছরের ২৪ এপ্রিল ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি এবং ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং এবং অন্যান্য উপদেষ্টাকে শপথ পড়ান। একই বছরের অক্টোবরে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে জোরাল আন্দোলন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তবে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে- এমন বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ কিংবা তার পদত্যাগের ঘটনা ঘটেনি। কারণ, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন স্পিকারের কাছে। কিন্তু দেশে তখন সংসদ ছিল না বিধায় কোনো স্পিকারও ছিলেন না।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি। সংবিধান অনুযায়ী, একজন রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ৫ বছর। সর্বোচ্চ দুবার দায়িত্ব পালন করতে পারেন তিনি। ২০২৩ সালের এপ্রিলে দায়িত্ব নেওয়া মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে। ফলে ওই পদে থাকা অবস্থায় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার আইনগত সুযোগ নেই। তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে কিংবা তাকে অভিশংসনের মুখোমুখি করা না হলে নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে কেউ শপথ নিতে পারবেন না।
প্রসঙ্গত, গত ১১ ডিসেম্বর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর তিনি সরে যেতে চান। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি ‘অপমানিত’ বোধ করছেন। বার্তা সংস্থাটিকে তিনি বলেছিলেন- ‘আমি সরে যেতে চাই, আমি সরে যেতে আগ্রহী। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত আমার দায়িত্ব পালন করে যাওয়া উচিত। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির পদে থাকায় আমি আমার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।’
এদিকে বিএনপি সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতি কে হবেন- এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা-গুঞ্জন চলছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে নতুন স্পিকার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। স্পিকারের কাছে রাষ্ট্রপতি যদি পদত্যাগপত্র জমা দেন তাহলে অভিশংসনের প্রয়োজন হবে না এবং কোনো জটিলতাও তৈরি হবে না।
অন্যদিকে মেয়াদ শেষ হওয়া, পদত্যাগ করা কিংবা অভিশংসনজনিত কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নির্বাচনের আয়োজন করে থাকে নির্বাচন কমিশন। সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন আয়োজন করে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ‘নির্বাচনী কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে তফসিল ঘোষণা করা হয়। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মেয়াদ শেষের কারণে পদ শূন্য হলে মেয়াদ শেষ হওয়ার ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একজন প্রার্থী মনোনয়নের জন্য দুজন সংসদ সদস্যের প্রয়োজন হয়। তাদের একজন আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব করেন, অন্যজন সমর্থন দেন। একক প্রার্থী হলে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয় না। তফসিল ঘোষণার পর সংসদ অধিবেশন চলাকালে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। যদি তখন অধিবেশন না থাকে, তবে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে অন্তত সাত দিন আগে অধিবেশন আহ্বান করতে হয়।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৯৭টির ফল ঘোষণা করা হয়েছে। এতে বিএনপি ২০৯টি আসন পেয়েছে। তাদের জোটের শরিকরা আরও তিনটি আসনে জয়ী হয়েছে। স্থগিত থাকা দুটি আসনেও বিএনপির প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন পেয়েছে। তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি ছয়টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি, খেলাফত মজলিস একটি, ইসলামী আন্দোলন একটি আসনে জয়ী হয়েছে। এ ছাড়া স্বতন্ত্র সাত সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, যাদের সবাই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী।