• মাধুকর প্রতিনিধি
  • এই মাত্র

লোকসানের আশংকা মধ্যপাড়া পাথরখনি ব্লাস্ট ও বোল্ডার বিক্রি নেই উৎপাদন বন্ধ হতে পারে



এম এ জলিল সরকার পার্বতীপুর প্রতিনিধি ►
দিনাজপুরের পার্বতীপুরে মধ্যপাড়া পাথরখনি লোকসানের মুখে পড়েতে আশংকা। গত দুই অর্থবছরে দেশের একমাত্র ভূগর্ভস্থ পাথরখনিটি ৪৪ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। চলতি অর্থবছরও লোকসান হবে। লোকসানের অন্যতম কারণ ডলার মূল্য বৃদ্ধি ও পাথর উৎপাদন কাজে ব্যবহৃত অতি গুরত্বপূর্ণ এক্সপ্লোসিভ ‘অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট’ আমদানীর উপর সিটিভ্যাট আরোপ। ফলে উৎপাদন খরচের চেয়ে গড়ে আনুমানিক ৫০০ টাকা কমে প্রতিটন পাথর বিক্রি করতে হচ্ছে। পাথর মধ্যপাড়া খনিকে সচল রাখতে হলে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট আমদানীর উপর আরোপিত সিটিভ্যাট প্রত্যাহার, পাথর আমদানীর উপর শুল্ক বৃদ্ধি ও মধ্যপাড়ার পাথরের ট্যারিপ ভ্যালু বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

জানা গেছে, মধ্যপাড়া খনির ১২শ-১৩শ ফুট নীচ থেকে হেভি মেশিনারীজ ব্যবহার করে পাথর উত্তোলন করা হয়। ভূগর্ভে প্রথমে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের তিনটন এক্সপ্লোসিভ ব্যবহার করতে হয়। এক্সপ্লোসিভ আমদানী করতে হয় বিদেশ থেকে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এক্সপ্লোসিভের দাম অনেক বেড়ে গেছে। আমেরিকা, ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের কারণে তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। বিদেশে সারফেজে পাথর পাওয়া যায় এবং উৎপাদন খরচ অনেক কম। মধ্যপাড়ার পাথর বিক্রি করতে হয় আমদানী মূল্যের সাথে প্রতিযোগিতা করে। যেহেতেু মধ্যপাড়ায় পাথর উত্তোলন খরচ বেশী, সেহেতু সরকারের বিশেষ সহযোগিতা প্রয়োজন। সুত্রমতে, পাথর আমদানীর ক্ষেত্রে প্রতিটন পাথরের বেইজ ভ্যালু ১২-১৩ ডলার নির্ধারণ করে শুঙ্কারোপ করায় আমদানি খরচ কম হয়।

সেক্ষেত্রে পাথরের বেইজ ভ্যালু বৃদ্ধি করে শুঙ্কায়ন করা হলে আমদানি মূল্য বৃদ্ধি পাবে এবং প্রতিযোগিতামুলক বাজারে মধ্যপাড়ার পাথর বিক্রি করা সহজ হবে। সুত্র জানায়, পূর্বে খনিজ সম্পদ উন্নয়ন বুরে‌াকে (বিএমডি) শুধুমাত্র বিক্রিত পাথরের উপর গড়ে ২.৫ শতাংশ রয়্যালটি প্রদান করা হতো। বর্তমানে দিতে হয় ৫ শতাংশ। এক্সপ্লোসিভ আমদানি করতে ৩৭ শতাংশ সিটিভ্যাট দিতে হয়। যা আগে ছিল শুন্য শতাংশ। তাছাড়া, চুক্তি অনুযায়ী উৎপাদন ঠিকাদারের বিল পেমেন্টের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা ও ২০ শতাংশ দেশীয় মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। চুক্তির সময় ডলার বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা। বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১২৩ টাকা হয়েছে।

ফলে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে মজুদকৃত পাথর দ্রুত বিক্রি ও স্টক ইয়ার্ড খালি করে উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখার স্বার্থে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে উৎপাদন খরচের চেয়ে গড়ে আনুমানিক প্রতিটন পাথর ৫০০ টাকা কমে বিক্রি করা হচ্ছে বলে সুত্র জানায়। তাছাড়া, খনিতে প্রতিদিন রেকর্ড পরিমাণ পাথর উৎপাদন হচ্ছে। খনি ইয়ার্ডে প্রায় ১৫ লাখ টন পাথরের বিশাল মজুদ গড়ে উঠেছে। এরমধ্যে ব্লাস্ট (রেলপথে ব্যবহৃত) ও বোল্ডার (নদী শাসন কাজে ব্যবহৃত) রয়েছে প্রায় ১৩ লাখ ২৭ হাজার টন। প্রতিদিন এর পরিমাণ বাড়ছে। ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পানি উন্নয়ন বোর্ড’ রাষ্ট্রীয় এই দুই প্রতিষ্ঠানের জন্যই ব্লাস্ট ও বোল্ডার উৎপাদন করা হয়। বিগত সরকারের সময়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে কয়েকটি মেগা প্রকল্পে নতুন রেলপথ নির্মাণে ভারত থেকে আমদানিকৃত পাথরের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

এর ফলে গত চার বছর ধরে রেলপথে মধ্যপাড়ার ব্লাস্ট পাথরের ব্যবহার কমে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ মজুদ গড়ে উঠেছে। দ্রুত ব্লাস্ট ও বোল্ডার পাথর বিক্রিতে গতি বাড়াতে না পারলে স্থানাভাবে খনির উৎপাদন বন্ধের আশংকা রয়েছে। উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে প্রায় ৮ শত খনি শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে। মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানী লিমিটেডের (এমজিএমসিএল) মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সৈয়দ রফিজুল ইসলাম জানান- শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বপ্নের খনি বেগম খালেদা জিয়া কর্তৃক উদ্বোধন করা হয় ১৯৯৪ সালে এবং ২০০৭ সাল থেকে উৎপাদনে যায়। ২০১৮- ১৯ থেকে টানা পাচঁ অর্থবছর খনিটি লাভ করে ১০০ কোটি টাকা এবং দেনা পরিশোধ করে ৪০ কোটি টাকা পেট্রোবাংলাকে দেয়। কিন্তু হঠাৎ করে ডলার মূল্য বেড়ে যাওয়ায় ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করতে অতিরিক্ত প্রায় ৪৫ শতাংশ টাকা লাগছে।

ফলে গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৭ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭ কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরও লোকসানে রান করছে খনিটি। পাথর আমদানীর উপর শুল্ক বৃদ্ধি ও মধ্যপাড়ার পাথরের ট্যারিপ ভ্যালু বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। এমজিএমসিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী ডি.এম. জোবায়েদ হোসেন গত মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) জানান- মধ্যপাড়ার পাথর বিক্রি করতে হয় আমদানী মূল্যের সাথে প্রতিযোগিতা করে। মধ্যপাড়ায় পাথর উত্তোলন খরচ বেশী এজন্য সরকারের বিশেষ সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। খনি সচল রাখার জন্য যদি কিছু ট্যাক্স রিলিভ (ছাড়) পাওয়া যায় তাহলে উৎপাদন খরচ কমে যাবে। বিশেষ করে বিস্ফোরক আমদানীর ক্ষেতে যদি ট্যাক্স ছাড় পাওয়া যায়। উৎপাদন খরচ কমে গেলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে সিটি ভ্যাট, ট্যাক্স সরকারি কোষাগারে বেশী জমা হবে। মধ্যপাড়ার খনি আছে বলেই আমদানী মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। তিনি বলেন, গত ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত খনি ইয়ার্ডে মজুদ পাথরের পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ ৯০ হাজার মে.টন।

এর মধ্যে ব্লাস্ট প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টন এবং বোল্ডার ৩ লাখ ৭৭ হাজার টন রয়েছে। খনির মোট উৎপাদনের ৫১ শতাংশ ব্লাস্ট ও বোল্ডার পাথর। কিন্তু ব্লাস্ট ও বোল্ডার বিক্রিতে গতি নেই। এই দুই সাইজের পাথর বিক্রির গতি না বাড়লে স্থানাভাবে কিছু দিনের মধ্যে পাথর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে এমডি বলেন, দেশে প্রতিবছর পাথরের চাহিদা ৩ কোটি টনের বেশী। মধ্যপাড়ায় উৎপাদন হয় ১৫-১৬ লাখ টন। যা মোট চাহিদার ৫-৭ শতাংশ। বাকী পাথর বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়।

এদিকে, ২০০৭ সালের ২৫ মে মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। ২০১৪ সাল থেকে খনির উৎপাদন ও রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে বেলারুশের জেএসসি ট্রেস্ট সকটোস্ট্রয় ও দেশীয় একমাত্র মাইনিং কাজে অভিজ্ঞ প্রতিষ্টান জার্মানিয়া করপোরেশন লিমিটেড নিয়ে গঠিত জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)। জিটিসি ইউরোপিয়ান প্রকৌশলীদল ও দক্ষ খনি শ্রমিক দিয়ে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টন পাথর উত্তোলন করছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি।