• মাধুকর প্রতিনিধি
  • এই মাত্র

বাম্পার ফলন, কিন্তু আলু এখন ‘গলার কাঁটা’



অনলাইন ডেস্ক

রংপুর বিভাগে চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। ভরা মৌসুমেই আলুর দামে চরম ধস নামায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাজারো চাষি। বর্তমান বাজারে আলু বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, হিমাগার ভাড়া ও পরিবহন ব্যয়ও তুলতে পারছেন না তারা। রংপুরের গঙ্গাচড়া, মিঠাপুকুর ও পীরগাছা উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে আলুর দাম মণপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত কমে গেছে। বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ আলু পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়, যা কেজিপ্রতি মাত্র ৬ থেকে ৭ টাকা। অথচ কৃষকদের দাবি, এক মণ আলু উৎপাদনে তাদের খরচ হয়েছে প্রায় ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা।

কৃষকরা জানান, ভালো দামের আশায় অনেকেই আলু হিমাগারে রাখতে চাইলেও পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে ঘরে আলু সংরক্ষণ করছেন তারা। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও আর্দ্রতার কারণে সেসব আলুতে পচন ধরছে। অনেক ক্ষেত্রে পোকামাকড়ের আক্রমণেও নষ্ট হচ্ছে ফসল। গঙ্গাচড়া উপজেলার চেংমারী গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান জানান, প্রায় ৩০০ শতক জমিতে আলু চাষ করেছিলেন তিনি। শুরুতে কম দামে বিক্রি না করে ঘরে সংরক্ষণ করেন। কিন্তু সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে শেষ পর্যন্ত প্রায় ৫০ বস্তা আলু ফেলে দিতে হয়েছে। 

একই এলাকার কৃষক পারভিন আক্তার জানান, নিজের ও লিজ নেওয়া জমিসহ প্রায় ৫০০ শতক জমিতে আলু চাষ করতে গিয়ে বড় অঙ্কের ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়েছেন তিনি। ফলন ভালো হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন। ঘরে রাখা প্রায় ২০০ বস্তা আলুর বড় অংশই পচে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। 

লালমনিরহাটের এক কৃষক বলেন, ঘরে রাখা আলুতে পোকা ধরতে শুরু করেছে। এভাবে আর বেশি দিন রাখা সম্ভব নয়। অনেকেই বাধ্য হয়ে কীটনাশক ব্যবহার করে কিছুদিন সংরক্ষণের চেষ্টা করছেন। পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে আলুর অতিরিক্ত সরবরাহ এবং হিমাগারে জায়গা সংকটের কারণে তারা নতুন করে আলু কিনতে ঝুঁকি নিচ্ছেন না। অনেক আড়তদার কম দামে আলু কিনে রাখলেও লোকসানের আশঙ্কায় তা বাজারে ছাড়ছেন না। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় আলুর আবাদ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫১ লাখ ৭৮ হাজার টন। কিন্তু হিমাগারের ধারণক্ষমতা মাত্র প্রায় ১১ লাখ টন, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ২২ শতাংশ সংরক্ষণের সুযোগ দেয়। হিমাগার মালিকদের মতে, বিদ্যুৎ বিল, জেনারেটর খরচ ও শ্রমিক ব্যয়সহ বিপুল খরচ বহন করতে হয়। 

গত বছর আলুর দাম কম থাকায় অনেক কৃষক তাদের সংরক্ষিত আলু বের করেননি, ফলে ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারাও। এদিকে, আলু রপ্তানির হারও আশানুরূপ নয়। কয়েক বছর আগে যেখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আলু রপ্তানি হয়েছিল, বর্তমানে তা অনেক কমে গেছে। কৃষকরা বলছেন, আলুর বাজার স্থিতিশীল করতে দ্রুত সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে আলু সংগ্রহ এবং রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় আগামী মৌসুমে আলু চাষে আগ্রহ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।