• মাধুকর প্রতিনিধি
  • এই মাত্র

তৃণমূলের ভরাডুবি, পশ্চিমবঙ্গে প্রথম ক্ষমতায় আসছে বিজেপি




অনলাইন ডেস্ক ►
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে ধারণার চেয়েও বড় জয় পেতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। সোমবার রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যটিতে তারা দুই শতাধিক আসনে এগিয়ে রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের লাগোয়া এই রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। তার দল তৃণমূল কংগ্রেস শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৮১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে।

২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোটগ্রহণ হয়। তাতে রেকর্ড ৯৩ শতাংশ ভোট পড়ে, যা পুরো ভারতেই নজিরবিহীন। অনিয়মের অভিযোগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা কেন্দ্রের ভোট বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। ওই কেন্দ্রে ফের ভোট হবে ২১ মে। ফলে সোমবার প্রকাশ করা হবে ২৯৩ আসনের ফল।

৪৯ বছর পর কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার
এদিকে ১৫ বছর পর বাংলার মসনদে এই পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘ ৪৯ বছর পর পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসছে ডাবল ইঞ্জিন সরকার। অর্থাৎ, কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার পাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ। ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে গঠিত কংগ্রেস সরকার ১৯৭৭ পর্যন্ত ডাবল ইঞ্জিন হিসেবে কার্যকরী ছিল।  সিদ্ধার্থ শংকরের কংগ্রেস সরকারের পতনের পর যুক্তফ্রন্ট বামফ্রন্ট ও তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘমেয়াদী শাসন। দীর্ঘ ৪৯ বছর পর অবশেষে ডাবল ইঞ্জিন সরকার হিসেবে ক্ষমতায় এলো বিজেপি।

বেসরকারি ফলাফল
ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাত পৌনে ১০টা নাগাদ বেসরকারি ফলাফলে বিজেপি ১৬৭টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস বিজয়ী হয়েছে ৫৯টি আসনে। যে ৬১টি আসনে ফলাফল ঘোষণা এখনো বাকি রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বিজেপি ৪১টি আর তৃণমূল কংগ্রেস ২০টি এগিয়ে রয়েছে। কংগ্রেস আর সিপিআই (এম) বিজয়ী হয়েছে দুইটি করে আসনে। অন্যদিকে অল ইন্ডিয়া সেক্যুলার ফ্রন্ট বিজয়ী হয়েছে একটি আসনে।

মোদি বললেন, পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে
ছাব্বিশে বাংলা দখলে মরিয়া ছিল বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনী প্রচারে এসে বারবার বলেছিলেন, বাংলার মানুষ পরিবর্তন চায়। তারা কাজ চায়, সম্মান চায়। তাই এবার বাংলায় পদ্ম ফুটবেই। জনসভা থেকেই মোদি দাবি করেছিলেন, বাংলার কয়েকটি জেলায় একটি আসনও দখল করতে পারবে না তৃণমূল। সোমবার ফলাফল প্রকাশিত হতেই দেখা গেল, মোদির কথাই মিলে গেছে। বাংলার ৯টি জেলায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল ঘাসফুল শিবির।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে এখন পর্যন্ত পাওয়া ফল অনুযায়ী বিজেপি এগিয়ে রয়েছে। বিজেপির এই ফল নিয়ে একটি বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে! ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। জনগণের শক্তির জয় হয়েছে এবং বিজেপির সুশাসনের রাজনীতি জয়ী হয়েছে।

তিনি আরও লেখেন, আমি পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যেক ব্যক্তিকে প্রণাম জানাই। জনগণ বিজেপিকে এক অভূতপূর্ব রায় দিয়েছেন এবং আমি তাদের আশ্বাস দিচ্ছি যে, আমাদের দল পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করবে। আমরা এমন একটি সরকার দেব, যা সমাজের সকল স্তরের মানুষের সুযোগ ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে।

বিজেপির জয় অনৈতিক বলছে মমতা
এদিকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ তুলেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিজেপি ১০০টিরও বেশি আসন চুরি করেছে। বিজেপি জালিয়াতি করেছে। নির্বাচন কমিশন এখন বিজেপি কমিশনে পরিণত হয়েছে। আমরা বারবার এ নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছি। কিন্তু কেউ শোনেনি।

মমতা বলেন, ‘বিজেপির এই জয় অনৈতিক। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যোগসাজশে নির্বাচন কমিশন যা করেছে তা পুরোপুরি অনৈতিক। তারা জোরপূর্বক এসআইআর পরিচালনা করেছে। তারা অত্যাচার চালিয়েছে। তারা কাউন্টিং এজেন্টদের গ্রেপ্তার করেছে। আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।

বিজয় উল্লাস গেরুয়া কর্মীদের  
এদিকে ভোটের ফলাফল প্রকাশ হতেই কলকাতা থেকে জেলা সর্বত্র বিজেপি কর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে। বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠেছেন গেরুয়া শিবিরের কর্মী-সমর্থকরা। দেড় দশক আগে হুগলির সিঙ্গুর থেকে উত্থান হয়েছিল তৃণমূলের। সেই সিঙ্গুরেই তৃণমূল দুর্গের পতন ঘটিয়ে উত্থান হল বিজেপির। এই জয়ে বুলডোজার নিয়ে অভিনবভাবে আনন্দে মাতলেন মালদহের বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা। সেই সঙ্গে একাধিক ডিজে বাজনা এবং চলছে আবির খেলা। এমনকি দলটির রাজ্যসভার সংসদ সদস্যহর্ষবর্ধন শ্রিংলাকেও উচ্ছ্বাসে মেতে উঠতে দেখা যায়।

নন্দীগ্রাম আসনে জয়ী শুভেন্দু ,ভবানীপুরেও এগিয়ে
বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুর আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিজেপির নেতা শুভেন্দু অধিকারী। দক্ষিণ কলকতার সাখাওয়াত মেমোরিয়ালে এই আসনের ভোট গণনা চলছে। দিনের শুরুর দিকে গণনায় এগিয়ে ছিলেন মমতা। কিন্তু বিকেলে কমাতে থাকে ব্যবধান।

এই পরিস্থিতিতে গণনাকেন্দ্র ঘিরে তৃণমূল ও বিজেপির নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে মমতা ও শুভেন্দু দুজনই গণনাকেন্দ্রে হাজির হন। নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন দুই প্রার্থীরই মোবাইল বাজেয়াপ্ত করে।

ভোটগণনার একপর্যায়ের সন্ধ্যার পর শুভেন্দু মমতার চেয়ে বেশি ভোটে এগিয়ে যান। এ সময় মমতা ভোটকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যান। স্থানীয় সময় রাত পৌনে আটটায় শুভেন্দু তার প্রতিদ্বন্দ্বী মমতার চেয়ে ২৯৫৬ ভোটে এগিয়ে ছিলেন। ইতোমধ্যেই নন্দীগ্রাম আসন থেকে জয়ী হয়েছেন শুভেন্দু। তিনি হারিয়েছেন তৃণমূলের প্রার্থী পবিত্র করকে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে এই দুইটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন শুভেন্দু।

মমতার গাড়ি লক্ষ্য করে চোর স্লোগান
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনার দিন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে গণনাকেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পৌঁছালে উত্তেজনা তৈরি হয়। এসময় বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা তার গাড়ি লক্ষ্য করে চোর চোর স্লোগান দেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তৃণমূল কর্মী-সমর্থকরা প্রতিবাদ করলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।  

মমতা ও শুভেন্দুর মোবাইল নিয়ে নিতে বলল কমিশন
সাখাওয়াতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারীর মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয় কমিশন। মোবাইল নিয়ে গণনাকেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি নেই। সূত্র জানায়, তাদের দুই জনের কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, যতক্ষণ তারা বের হবে না ততক্ষণ ভোট গণনা হবে না। পরে মমতা নিজেই গণনা কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যান। ফের শুরু হয় গণনা।

মানুষ যে রায় দেবে, সভ্য সমাজের উচিত তা মাথা পেতে নেওয়া
ফলাফল নিয়ে বিকেলে বিকালে মুখ খোলেন মমতার ভাতিজা ও দলটির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি। তিনি বলেন, মানুষ যে রায় দেবে, সভ্য সমাজের উচিত তা মাথা পেতে নেওয়া। এখনো গণনার অনেক সময় বাকি রয়েছে। আমি দলের কাউন্টিং এজেন্টদের বলবো তারা যেন গণনা কেন্দ্র ছেড়ে না বের হয়। তারা যেন ধৈর্য ধরে।

পশ্চিমবঙ্গে এবার প্রায় ২ হাজার ৯০০ এর বেশি প্রার্থীর ভাগ্য পরীক্ষা হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী ছাড়াও বিজেপির জয়ী প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন- দিলীপ ঘোষ (খড়গপুর সদর), সাবেক কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক (মাথাভাঙ্গা), অগ্নিমিত্রা পাল (আসানসোল দক্ষিণ), স্বপন দাশগুপ্ত (রাসবিহারী), অভিনেত্রী রূপা গাঙ্গুলী (সোনারপুর দক্ষিণ), অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ (শিবপুর), অভিনেতা হিরন্ময় চ্যাটার্জি (শ্যামপুর), আরজিকর হাসপাতালের নিহত তরুণী চিকিৎসকের মা রত্না দেবনাথ প্রমুখ।

অন্যদিকে তৃণমূলের যেসব প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন- মন্ত্রী শোভন দেব চট্টোপাধ্যায় (বালিগঞ্জ), মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম (কলকাতা বন্দর), মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস (টালিগঞ্জ), অভিনেত্রী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় (চৌরঙ্গী) প্রমুখ।

অন্য দলগুলির মধ্যে ভাঙ্গর আসনে জয়ী হয়েছেন- ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) প্রার্থী পীরজাদা নওশাদ সিদ্দিকী। আম জনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর (রেজিনগর) প্রমুখ।

পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি আসামে ১২৬ টি আসনে, কেরালায় ১৪০ আসনে, তামিলনাড়ুতে ২৩৪ আসনে এবং পুদুচেরিতে ৩০ আসনের ফলাফলও ঘোষিত হয়েছে।

কেরালায় মোট আসন ১৪০। সেখানে সরকার গড়তে প্রয়োজন ৭১ আসন। এই রাজ্যটিতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) ১০২ আসনে এগিয়ে রয়েছে। সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এলডিএফ) ৩৫ আসনে এগিয়ে আছে, অন্যরা এগিয়ে আছে ৩ আসনে।

দক্ষিণ ভারতের রাজ্য তামিলনাড়ুতে মোট আসন ২৩৪। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১১৮ আসনে জয়। সেখানে দারুণ সাড়া জাগিয়েছে অভিনেতা বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্টরি কাঝাগাম (টিভিকে)। ১০৮ আসনে এগিয়ে আছে তারা। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল দ্রাবিড়া মূনেত্রা কাঝাগাম (ডিএমকে) ৭৩ আসনে এগিয়ে আছে এবং অল ইন্ডিয়া দ্রাবিড়া মূনেত্রা কাঝাগাম (এআইএডিএমকে) ৫৩ আসনে এগিয়ে আছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বড় চমক দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল টিভিকে। দুই বছরের মাথায় দক্ষিণী সুপারস্টার থালাপতি বিজয়ের দলের চমক।

এদিকে আসামে টানা তৃতীয়বারের জন্য সরকার গড়ার পথে বিজেপি। এ রাজ্যে ১২৬ আসনের মধ্যে ম্যাজিক ফিগার ৬৪। এর মধ্যে বিজেপি ১০২ আসনে এগিয়ে আছে, কংগ্রেস ১৯ আসনে এবং অন্যরা ৫ আসনে এগিয়ে আছে।

কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতে মোট আসন ৩০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৬ আসন। এখানে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ২২ আসনে এগিয়ে আছে, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট ৬ আসনে এবং অন্যরা ১ টি মাত্র আসনে এগিয়ে আছে।