- মাধুকর প্রতিনিধি
- এই মাত্র
সুন্দরগঞ্জে পাগল কুকুরের কামড়ে ৪ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১২জন
এ মান্নান আকন্দ, সুন্দরগঞ্জ ►
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় পাগল কুকুরের কামড়ে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১২ জন। সর্বশেষ গত সোমবার দিবাগত রাতে উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বজড়া কঞ্চিবাড়ি গ্রামের আফরুজা বেগমের মৃত্যু হয়। এনিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল চারজনে। এর আগে গত ৬ মে মারা যান বজড়া কঞ্চিবাড়ি গ্রামের নন্দ রানী, মো. ফুল মিয়া এবং গত ৮ মে মারা যান পূর্ব ছাপড়হাটী গ্রামের রতনেশ্বর তিনি পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রী। বজড়া কঞ্চিবাড়ি গ্রামে কাজ করতে এসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। নিহত প্রত্যেক পরিবারকে ১০ হাজার টাকা চেক প্রদান করা হয়েছে।
পাগল কুকুরের আক্রান্তের পর আক্রান্তরা সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, গাইবান্ধা আধুনিক সদর হাসপাতাল ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন না পাওয়ার চিকিৎসা নিতে বিলম্ব হয়েছে। পরে বাইর থেকে ভ্যাকসিন কিনে চিকিৎসা করছেন। এনিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনের গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসি।
ঘটনাটি ঘটেছে গত ২২ এপ্রিল সকালে উপজেলার বজড়া কঞ্চিবাড়ি গ্রামে। স্থানীয় সাইদুর রহমান বলেন, সকাল ১০টার দিকে উপজেলার ধর্মপুর এলাকা থেকে দ্রুত গতিতে একটি কুকুর এসে বিষ্মুময়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে নন্দ রানীর মুখে কামড় দেয়। এরপর এক এক করে বজড়া কঞ্চিবাড়ি গ্রামের ১৫ জনকে কামড় দেয়। সর্বশেষ কামড় দেয় আতিকুর রহমানকে। সেই আতিকুর পরে কুকুরটিকে পিঠিয়ে মেরে ফেলে। আক্রান্তরা হলেন ফজিতন নেছা, রুমিনা বেগম, নজরুল ইসলাম, হামিদুল ইসলাম, সুলতানা বেগম, গোলেনুর বেগম, মিতু বেগম, আতিকুর মিয়া, লাবন্য আকতার, বিজয় হোসেন, জয়নাল আবেদীন, চাঁদনী বেগম। উপজেলা প্রশাসন ও কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ নিহত ও আহতদের নামের তালিকা নিশ্চিত করেছেন।
সরেজমিন এলাকায় গিয়ে আক্রান্তদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা এখন আতংকে রয়েছেন। মৃত্যুর সারি বাড়তে থাকায় অনেকের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা মেডিকেল বোর্ড গঠন করে সুচিকিৎসার দাবি জানিয়েছেন।
বজড়া কঞ্চিবাড়ি গ্রামের মেম্বর তাজরুল ইসলাম বলেন, পাগলা কুকুরের আক্রমনের খবর পাওয়ার পর পরই তিনি সকলের বাড়িতে ছুটে যান। সেই সাথে আক্রান্তদের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করেন এবং আক্রান্তদের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি আরও বলেন, সে মোতাবেক সকলে গাইবান্ধা আধুনিক সদর হাসপাতালে চলে যায়। কিন্ত অত্যন্ত কষ্টের বিষয় সেখানে কোনো ভ্যাকসিন ছিল না। এরপর অনেকে রংপুর যায় এবং বাইর থেকে ভ্যাকসিন কিনে চিকিৎসা শুরু করে। কুকুরটি সকলের নাকে, মুখে এবং চোখে আক্রমন করেছে। এ কারণে অনেকে বেশি অসুস্থ হয়েছে।
কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনোয়ার আলম সরকার বলেন, বিষয়টি তিনি ইউপি সদস্যদের মাধ্যমে জেনেছেন। আক্রন্তরা নিজের থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। বিষয়টি এতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে সেটি জানা ছিল না।
নিহত আফরুজা বেগমের ছেলে বলেন, তার মাকে গাইবান্ধা হতে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কতর্বরত চিকিৎসক তাদের সাথে খুব খারাপ আচারণ করেছেন। সেই হাসপাতালে ভ্যাকসিন নেই, বলে বাইর থেকে কিনে আনতে বলেন। সুচিকিৎসার অভাবে তার মায়ের মৃত্যু হয়েছে দাবি তার।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক মো. সেলিম রেজা বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ হতে তাৎক্ষনিকভাবে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সে কারণে বিষয়টি জানতে বিলম্ব হয়েছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার দিবাকর বসাক বলেন, বিষয়টি তার জানা ছিল না। এমনকি কেই তাকে জানাই নাই। গত সোমবার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সাংবাদিকের মাধ্যমে জেনেছি। তবে দীর্ঘদিন থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো প্রকার জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন সরবরাহ নেই।
উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন ডাক্তার মো. মোজাম্মেল হক বলেন, কুকুর নিধন আপাতত বন্ধ। সেই সাথে কুকুরের শরীরে ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম দীর্ঘদিন হতে বন্ধ রয়েছে। সে কারণে বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব বেড়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নিবার্হী অফিসার ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ঘটনাটি ইউনিয়ন পরিষদ হতে তাকে জানানো হয়নি। গত সোমবার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সাংবাদিকের মাধ্যমে জেনেছি। জানার পর পরই স্থানীয় জাতীয় সংসদ সদস্য মো. মাজেদুর রহমানের পরামর্শক্রমে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহত ও আহতদের বাড়িতে গিয়ে তাদের খোঁজ খবর নেয়া হয়। সেই সাথে নিহত পরিবারকে সহায়তা প্রদান করা হয়।
গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডাক্তার মো. রফিকুজ্জামান বলেন, পাগল কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে কয়েকজন হাসপাতালে এসেছিল বিষয়টি তিনি জানেন। কিন্তু দীর্ঘদিন হতে হাসপাতালে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন সরবরাহ নেই। যার কারণে সরকারিভাবে ভ্যাকসিন সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। অনেকে বাইর থেকে ভ্যাকসিন নিয়ে এসে চিকিৎসা নিয়েছেন। আবার অনেকে রংপুর হাসপাতালে চলে গেছেন।
গাইবান্ধা-১ সুন্দরগঞ্জ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য মো. মাজেদুর রহমান বলেন, বিষয়টি গত সোমবার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সাংবাদিকের মাধ্যমে জেনেছেন। মিটিং শেষ করে তাৎক্ষনিকভাবে উপজেলা প্রশাসনকে সাথে নিয়ে নিহত ও আহতদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ খবর এবং নিহতের পরিবারকে সহায়তা প্রদান করা হয়। হাসপাতালে ভ্যাকসিন না থাকার বিষয়টি তিনি স্বাস্থ্য বিভাগের দায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।