• মাধুকর প্রতিনিধি
  • এই মাত্র

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়কে গ্রামীণ কলেজ আখ্যা দিয়ে তোপের মুখে ক্ষমা চাইলেন ঢাবি শিক্ষক সাইম রানা



বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়কে (জাককানইবি) গ্রামীণ কলেজ বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কটূক্তি করার অভিযোগ উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সঙ্গীত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. জিয়াউর রহমান (সাইম রানা)-এর বিরুদ্ধে। তার এই অবমাননাকর মন্তব্যের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ার পর নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে পরবর্তীতে নিজের ভুল স্বীকার করে আরেকটি পোস্টে দুঃখপ্রকাশ ও ক্ষমা চেয়েছেন ওই শিক্ষক। 

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে সাইম রানা তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে একটি পোস্ট দেওয়ার পর। সেখানে তিনি বেশ কয়েক বছর আগে ত্রিশালের নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তবিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চরম আপত্তিকর মন্তব্য করেন। উক্ত পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, অনুষ্ঠান শেষে মধ্যাহ্নভোজের সময় কয়েকজন তাকে ঢাবির সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্স নিয়ে খোঁচা দিলে তিনি বিরক্ত হয়ে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি তাহলে এখন একটা গ্রামীণ কলেজের সাথে নিজেকে তুলনা করবে? এটা কি যায়? একটি প্রতিষ্ঠিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রকাশ্য ফোরামে গ্রামীণ কলেজ হিসেবে অভিহিত করায় মুহূর্তের মধ্যেই পোস্টটি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নজরে আসে এবং ক্যাম্পাসজুড়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের এমন সংকীর্ণ ও অহংকারী দৃষ্টিভঙ্গি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের এই তীব্র ক্ষোভ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার মুখে সাইম রানা প্রথমে তার পোস্টটি এডিট করে গ্রামীণ কলেজ শব্দটি বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে ততক্ষণে মূল পোস্টের স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি ফেসবুকের মাধ্যমে একটি দীর্ঘ ব্যাখ্যামূলক পোস্ট দিয়ে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা করতে বাধ্য হন। সেখানে তিনি দাবি করেন, অনুষ্ঠান চলাকালে কোনো এক কলেজ থেকে আসা ব্যক্তি বা অতিথির সাথে কথোপকথনের স্মৃতি থেকেই তার কলেজ বা গ্রামীণ প্রসঙ্গটি এসেছে, তিনি মূলত কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে ছোট করতে চাননি। তিনি তার তথ্যগত ত্রুটি স্বীকার করে সবাইকে বিষয়টি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানান। তবে তার এই দায়সারা ক্ষমা প্রার্থনা শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রশমন করতে পারেনি। নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে এই কটূক্তির সূত্র ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাইম রানার নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং ঢাবিতে তার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে পুরোনো অনিয়ম ও দুর্নীতির খতিয়ান প্রকাশ করছেন ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, যে শিক্ষক অন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে কলেজ বলে খাটো করছেন, স্বয়ং তার বিরুদ্ধেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত ও অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ২০১৪ সালের বিজ্ঞপ্তির শর্ত ভেঙে ২০১৫ সালে তাকে যখন প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন সঙ্গীতে তার কোনো বেসিক বা মৌলিক ডিগ্রিই ছিল না। শর্ত অনুযায়ী সঙ্গীত বিভাগে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করে তাকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে এনে সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক বানানো হয়। এই নিয়োগ জালিয়াতিতে ৬ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে ইতিমধ্যে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে এবং অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করে প্রতিবেদন পেশ করেছেন।

সাইম রানার এই প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগের কারণে সে সময় যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও চরমভাবে বঞ্চিত হয়েছিলেন জাহিদুল কবির নামের এক উচ্চযোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থী, যিনি সে সময় স্বয়ং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সাইম রানার বর্তমান কটূক্তির পর জাহিদুল কবিরের একটি পুরোনো মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। যেখানে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছিলেন যে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পিএইচডিসহ ৪টি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান এবং ১৫টি একক নামে গবেষণা থাকা সত্ত্বেও তাকে বঞ্চিত করে তৎকালীন ঢাবি প্রশাসন জালিয়াতির মাধ্যমে সাইম রানা ওরফে ড. জিয়াউরকে নিয়োগ দেয়।

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, যে শিক্ষক নিজেই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে, সঙ্গীতের নূন্যতম বেসিক ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতির মাধ্যমে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পদ দখল করে আছেন, তার মুখে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে গ্রামীণ কলেজ বলে অহংকার করা চরম হাস্যকর ও ধৃষ্টতার শামিল। 

এ বিষয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. সুশান্ত কুমার সরকার বলেন, তিনি কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এ কথা বলেছেন আমি জানিনা। এটা আসলে ঠিক না। কাউকে ছোট করে কখনও বড় হওয়া যায় না। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের দাবি, ক্ষমা চাইলেও একজন শিক্ষকের মনস্তত্ত্বে থাকা এমন প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও দেউলিয়াত্ব মেনে নেওয়া যায় না। ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এব জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
মাধুকর/এমআর