- মাধুকর প্রতিনিধি
- এই মাত্র
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কারণে পানির মাঝে ধ্বংসপ্রায় মসজিদ
সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর ►
দূর থেকে তাকালে মনে হবে বিশাল জলরাশির মাঝখানে একাকী দাঁড়িয়ে আছে কোনো ইতিহাসের শেষ স্মৃতিচিহ্ন। চারপাশে থৈ থৈ পানি, পানির বুক চিরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি ধ্বংসপ্রায় মসজিদ। পাশে কয়েকটি তাল ও খেজুরগাছ। অথচ মাত্র দুই দশক আগেও এখানে ছিল মানুষের কোলাহল, হাট-বাজার, স্কুল-মাদ্রাসা, সবুজ ধানের ক্ষেত আর হাজার বছরের বসতির প্রাণচাঞ্চল্য।
দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কারণে আজ সেই জিগাগাড়ী গ্রামসহ আশপাশের সাতটি গ্রামের অস্তিত্ব শুধুই স্মৃতির পাতায়। ২০০৫ সালে বড়পুকুরিয়া ভূগর্ভস্থ কয়লা খনি থেকে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা উত্তোলন শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে ভূমিধস দেখা দেয়। একসময় জিগাগাড়ী, কালুপাড়া, রসুলপুর, বৈদ্যনাথপুর, পাতি গ্রাম, পাতরা পাড়া ও মৌপুকুরসহ বিস্তীর্ণ জনপদ দেবে গিয়ে পানির নিচে তলিয়ে যায়। যেখানে একসময় মানুষের বসতি, রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, হাট-বাজার ও ফসলের মাঠ ছিল, সেখানে এখন সৃষ্টি হয়েছে বিশাল জলাশয়।
সবকিছু হারিয়েও অলৌকিকভাবে দাঁড়িয়ে আছে জিগাগাড়ী জামে মসজিদ। চারপাশের বাড়িঘর মাটির নিচে বিলীন হলেও শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদের গম্বুজ এখনও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে বর্ষা মৌসুমে মসজিদটির অর্ধেকের বেশি অংশ পানিতে ডুবে যায়। চারদিকে পানি থাকায় সেখানে নিয়মিত নামাজ আদায়ও সম্ভব হয় না। আজ আর ভেসে আসে না আজানের ধ্বনি; শোনা যায় শুধু স্মৃতিবিধুর মানুষের দীর্ঘশ্বাস।
স্থানীয় বাসিন্দা মোখলেসুর রহমান বলেন, "এখানে একসময় বড় হাট বসত। মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল-সবই ছিল। ধান, ভুট্টা, গমসহ নানা ফসলের চাষ হতো। এখন সেই জায়গায় শুধু পানি আর পানি। চোখের সামনে পুরো গ্রাম হারিয়ে যেতে দেখেছি। নূর মোহাম্মদ বলেন, "যেখানে একসময় মানুষের কোলাহল ছিল, শিশুদের হাসির শব্দ ছিল, সেখানে এখন শুধু নীরবতা। বিঘার পর বিঘা জমিতে ধান ফলত। আজ সবকিছুই পানির নিচে। স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই নেই।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল গফুর বলেন, "সরকার ক্ষতিপূরণ দিয়েছে, কিন্তু বাবার ভিটা, পূর্বপুরুষের কবর, গ্রামের স্মৃতি-এসব কি টাকায় ফেরত পাওয়া যায়? মাঝে মাঝে এখানে এসে মসজিদের দিকে তাকিয়ে বুকটা হাহাকার করে ওঠে। গৃহবধূ রওশন আরা বেগম বলেন, "এই মসজিদেই আমাদের পরিবারের সবাই নামাজ পড়তেন। ঈদের জামাত হতো। এখন সন্তানদের সেই গ্রামের গল্প শুনাই, কিন্তু তারা বিশ্বাসই করতে চায় না যে এই পানির নিচে একসময় এত বড় জনপদ ছিল। স্থানীয় শিক্ষক আব্দুস সাত্তার বলেন, "এই মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি হারিয়ে যাওয়া একটি সভ্যতার প্রতীক। যথাযথ সংরক্ষণ করা হলে এটি দেশের শিল্পায়নের মূল্য এবং মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরবে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভূমি অধিগ্রহণের সময় অনেক পরিবার ক্ষতিপূরণ পেলেও হারিয়ে যাওয়া সামাজিক বন্ধন, পূর্বপুরুষের স্মৃতি এবং গ্রামের ঐতিহ্যের কোনো মূল্যায়ন হয়নি। এখনও অনেক উচ্ছেদ হওয়া মানুষ মাঝেমধ্যে এই মসজিদের পাশে এসে দাঁড়ান। কেউ নীরবে দোয়া করেন, কেউ চোখের জল লুকিয়ে ফিরে যান।
অন্যদিকে, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা দেশের একমাত্র কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেই বিদ্যুৎ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আলো জ্বালাচ্ছে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে এই উন্নয়নের পেছনে হারিয়ে গেছে কয়েকটি গ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও হাজারো মানুষের শেকড়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, খনির কারণে আশপাশের প্রায় ১৩টি গ্রামের তিন হাজার একরেরও বেশি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভূমিধসের ফলে শত শত ঘরবাড়িতে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেয় এবং অনেক এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে তীব্র পানির সংকট।
বর্তমানে দেবে যাওয়া জিগাগাড়ী জামে মসজিদ এবং তার চারপাশের লেকসদৃশ এলাকা দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কেউ আসেন ইতিহাস জানতে, কেউ ছবি তুলতে, আবার কেউ ফিরে যান হারিয়ে যাওয়া এক জনপদের বেদনাময় গল্প হৃদয়ে নিয়ে। পানির বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা এই নিঃসঙ্গ মসজিদ যেন নীরবে জানিয়ে দেয়-উন্নয়নের আলো জ্বালাতে কখনও কখনও ইতিহাসের পুরো একটি জনপদকেই হারিয়ে যেতে হয়।