• মাধুকর প্রতিনিধি
  • এই মাত্র

কয়লা খনির বিস্ফোরণ-ভূগর্ভস্থ ধসে আতঙ্কে বড়পুকুরিয়ার ৫ হাজার মানুষ



সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর ►
দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ভূগর্ভস্থ কার্যক্রম ও বিস্ফোরণের ঝাঁকুনিতে বসতবাড়িতে ফাটল, কোথাও মাটি দেবে যাওয়া এবং ভূগর্ভস্থ কম্পনের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন খনি-সংলগ্ন এলাকার প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ। বিশেষ করে পাতরাপাড়া, বাঁশপুকুর ও কাজীপাড়া গ্রামের প্রায় এক হাজার পরিবারের অভিযোগ, কয়লা উত্তোলন শুরুর পর থেকে তাদের বসতভিটা ও ঘরবাড়িতে নানা ধরনের ক্ষয়ক্ষতি দেখা দিয়েছে। রাত নামলেই খনি এলাকায় ঝাঁকুনি বা বিস্ফোরণের শব্দে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঝুঁকিপূর্ণ ও ফাটল ধরা ঘরেই শিশু, নারী ও বয়স্কদের নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।

গত ২০০৫ সালে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক কয়লা উত্তোলন শুরুর পর থেকেই খনি-সংলগ্ন এলাকায় বসবাসরত মানুষের মধ্যে নানা ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়। খনির অধিগ্রহণ করা জমির বাইরে প্রায় ৫০০ একর এলাকায় বসবাসরত পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে বসতবাড়িতে ফাটল, মাটি দেবে যাওয়া, ভূগর্ভস্থ কম্পন ও পানির সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের দাবি, ভূগর্ভ থেকে কয়লা উত্তোলনের কারণে কোনো কোনো এলাকায় মাটি দেবে গেছে। এর ফলে একসময়কার বসতভিটা ও কৃষিজমির কিছু অংশ নিচু হয়ে জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, জিগাগাড়ি, মৌপুকুর, বড়পুকুরিয়া গ্রাম, কালুপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকায় একসময় যেখানে ঘনবসতি ও আবাদি জমি ছিল, সেসব স্থানে এখন পানি জমে থাকার দৃশ্য দেখা যায়। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি চললেও সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এদিকে খনির ভূগর্ভস্থ কার্যক্রমের সময় সৃষ্ট কম্পন ও বিস্ফোরণের ঝাঁকুনিতে বসতবাড়ির দেয়াল, মেঝে ও বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

সরেজমিনে পাতরাপাড়া, বাঁশপুকুর ও কাজীপাড়া এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে বেশ কিছু ঘরের দেয়াল ও মেঝেতে ছোট-বড় ফাটল দেখা গেছে। কোথাও ফাটল পুরোনো, আবার কোথাও নতুন করে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেছেন বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, খনি কার্যক্রমের প্রভাবে এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তরেও পরিবর্তন এসেছে। অনেক নলকূপে আগের মতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো কোনো গভীর নলকূপে পানি উঠলেও তা আয়রনযুক্ত হওয়ায় পান করার অনুপযোগী বলে দাবি তাদের। ফলে অনেক পরিবারকে খাবার পানির জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে গভীর নলকূপের পাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানির সংকট আরও তীব্র হয় বলে জানান তারা।

স্থানীয়দের দাবি, খনি কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ কারিগরি কমিটি গঠন করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বসতবাড়ি, মাটি ও ভূগর্ভস্থ অবস্থার পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জরিপ করা হোক। একই সঙ্গে খনি কার্যক্রমের সঙ্গে বসতবাড়িতে ফাটল, মাটি দেবে যাওয়া ও ভূগর্ভস্থ কম্পনের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা। ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন অথবা ন্যায্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করারও দাবি তাদের।

বাঁশপুকুর পাড়ার বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন বলেন, বহু বছর ধরে আমাদের ঘরবাড়িতে ফাটল দেখা দিচ্ছে। খনির কাজ চলার সময় মাঝেমধ্যে ঝাঁকুনি অনুভূত হয়। এতে পরিবারের সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ফাটল ধরা ঘরে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বসবাস করতে খুব ভয় লাগে। আমরা নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তা চাই।  একই গ্রামের শাহাদাত হোসেন বলেন, খনির ঝাঁকুনি শুরু হলে আমরা বুঝতে পারি না কী হবে। ঘরের দেয়ালে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। কর্তৃপক্ষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার স্থায়ী সমাধান দাবি করে আসছি।

কাজী পাড়ার জরিনা বেগম বলেন, আমাদের ঘরবাড়িতে ফাটল ধরেছে অনেক দিন হলো। ফাটল দিন দিন বড় হচ্ছে। বৃষ্টি হলে আরও ভয় লাগে। কখন ঘরের কোনো অংশ ভেঙে পড়ে, সেই আতঙ্কে থাকতে হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আরেক বাসিন্দা হাজেরা বেগম বলেন, রাত হলেই ভয় লাগে। খনি থেকে ঝাঁকুনি এলে ঘরের ভেতরে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। সন্তানদের নিয়ে নিরাপদে ঘুমাতে পারি না। আমরা চাই, আমাদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হোক। প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসন করতে হবে।

বাঁশপুকুর পাড়ার সোহেল রানা বলেন, আমাদের এলাকার অনেক বাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছে। শুধু ঘরবাড়ি নয়, মাটিরও বিভিন্ন জায়গায় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে কথা বললেও আমরা কার্যকর সমাধান পাইনি। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। 
কাজীপাড়ার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা চাই কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে এসে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি পরিদর্শন করুক। খনি কার্যক্রমের কারণে ক্ষতি হয়ে থাকলে তার বৈজ্ঞানিকভাবে তদন্ত করা দরকার। ক্ষতিগ্রস্তদের হয় জমি অধিগ্রহণ করে পুনর্বাসন করতে হবে, নয়তো নিয়মিত ও যথাযথ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।

পাতরাপাড়া বসতবাড়ি রক্ষা কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। সরকার আমাদের কিছু জমি অধিগ্রহণ করেছে। এখন বাকি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাও অধিগ্রহণ করে অন্যত্র নিরাপদ পরিবেশে বসবাসের ব্যবস্থা করা হলে আমরা এখান থেকে চলে যেতে চাই। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আর এখানে বসবাস করতে চাই না। আমরা একাধিকবার এলাকার মানুষের স্বাক্ষরসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দিয়েছি, আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। কিন্তু এখনো এর বাস্তবায়ন তেমন দেখা যাচ্ছে না। দেশের স্বার্থে আমরা প্রয়োজনে বাপ-দাদার ভিটেমাটি সরকারের কাছে তুলে দিতে প্রস্তুত। তবে আমরা চাই, আমাদের অন্যত্র নিরাপদ ও ভালো পরিবেশে পুনর্বাসন করা হোক, যাতে ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎও নিরাপদ হয়।

তিনি আরও বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করছি। কিন্তু এভাবে বছরের পর বছর আন্দোলন করে যাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান করতে হবে। যদি খনি কার্যক্রমের কারণে আমাদের বসতবাড়ি ও জমিজমা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তাহলে সঠিকভাবে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নিয়মিত ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। দ্রুত সমাধান না হলে আমরা বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হব।

এ বিষয়ে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শাহ আলমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।