• মাধুকর প্রতিনিধি
  • এই মাত্র

জলবায়ু-সহিষ্ণু নারীকেন্দ্রিক উদ্যোগ জোরদার করছে সরকার



বাসস ►
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় নারীদের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে অভিযোজন কৌশল বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ। জলবায়ু-সংবেদনশীল কর্মসূচি ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলীয় ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে থাকায় তাদের সহনশীলতা বৃদ্ধি, জীবিকা সুরক্ষা এবং নিরাপদ জীবনযাপন নিশ্চিত করতে লক্ষ্যভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সব মানুষের ওপর সমানভাবে পড়ে না। তাই টেকসই অভিযোজন নিশ্চিত করতে নারীদের জন্য বিশেষভাবে পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তাদের মতে, বিদ্যমান সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও শ্রমের লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনের কারণে দুর্যোগের সময় এবং পরবর্তী সময়ে নারীদের ওপর দায়িত্ব ও চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে।

সরকারের সর্বশেষ জলবায়ু বাজেটেও এ অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটেছে। এতে নারীর ক্ষমতায়ন, জলবায়ু অভিযোজন এবং সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পৃথক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ‘জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন ও অভিযোজনে নারীর সক্ষমতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক কর্মসূচির জন্য ৬ হাজার ৮৮৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে জলবায়ুজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নারীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের সহনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ অভিযোজন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়া এসব অঞ্চলে নারীদের পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে, জীবিকা রক্ষা করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার মতো লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় সরকার জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করছে। এর অংশ হিসেবে ব্রি ধান-৬৭ চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, যাতে লবণাক্ত পানির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত একফসলি কৃষির পরিবর্তে গ্রামীণ নারীরা আবার খাদ্য উৎপাদন ও পারিবারিক আয় পুনরুদ্ধার করতে পারেন। সরকারের অভিযোজন কৌশল শুধু জীবিকা উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ নয়; নারীদের বিশেষ প্রয়োজন বিবেচনায় জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জলবায়ু অভিযোজনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যয়বহুল খাত হিসেবে অবকাঠামো উন্নয়নকে বিবেচনায় নিয়ে ‘প্রত্যন্ত এলাকায় নারীদের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ’ খাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২২ হাজার ১৬৪ কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নবনির্মিত ও সংস্কার করা ঘূর্ণিঝড় ও দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্রে নারীদের জন্য পৃথক স্যানিটেশন ব্যবস্থা, ওয়াশ ব্লক এবং নির্ধারিত নিরাপদ স্থান রাখা হচ্ছে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে তাদের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা যায়।

স্থানীয় সরকার বিভাগ দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং পৃথক শৌচাগার নির্মাণও সম্প্রসারণ করছে। এর মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখা এবং স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার মান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জলবায়ুজনিত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে সরকার গ্রামীণ হাট-বাজারে নারীদের জন্য পৃথক বিপণন এলাকা গড়ে তুলছে। এর ফলে নারী উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসা পরিচালনা ও পারিবারিক আয় ধরে রাখার সুযোগ পাচ্ছেন।

এসব উদ্যোগ জলবায়ু সহনশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে একীভূত করার বৃহত্তর জাতীয় কৌশলের অংশ। জলবায়ু বাজেট প্রতিবেদন ২০২৬-২৭-এর ভূমিকায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে জলবায়ু ঝুঁকি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের লক্ষ্যের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তাই জলবায়ু-সহনশীল ও জলবায়ু-সংবেদনশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।

জাতীয় বাজেট বক্তৃতায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, বারের বাজেটট দশটি কৌশলগত অগ্রাধিকারকে কেন্দ্র করে প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে দেশকে সুরক্ষিত করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই, সবুজ, জলবায়ু-সহনশীল ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা অন্যতম। তিনি আরও বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার রূপান্তরমূলক যাত্রা শুরু করেছি, যা হবে প্রতিযোগিতামূলক, উৎপাদনশীল, ন্যায়সম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ক্রমাগত পরিবর্তিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সহনশীল অবকাঠামো, জীবিকা সহায়তা এবং নারীর ক্ষমতায়নকে সমন্বিত করে লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এর মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু-সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সরকারের অঙ্গীকার আরও সুদৃঢ় হচ্ছে।