• মাধুকর প্রতিনিধি
  • এই মাত্র

মৌলিকত্ব হারানোয় নব্বইয়ের দশকে পিছিয়ে পড়ে লোকগল্পের সিনেমা



অনলাইন ডেস্ক ►
লোকগল্প নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের সুবর্ণ সময় ছিল ষাট ও সত্তরের দশক। বাংলাদেশের সিনেমার অন্যতম সেরা নির্মাতা খান আতাউর রহমানও লোকগল্প নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে যুক্ত ছিলেন। ১৯৬৮ সালে দিলীপ সোমের পরিচালনায় আসে ‘সাত ভাই চম্পা’। বাংলা লোকগল্পের অন্যতম জনপ্রিয় সিনেমা এটি। কবরী ও আজিম অভিনীত সিনেমাটির চিত্রনাট্য ও সংলাপ ছিল খান আতাউর রহমানের। ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট সিনেমাটিকে সর্বকালের সেরা ১০ বাংলা চলচ্চিত্রের তালিকায় রেখেছে। একই বছর খান আতাউর রহমান পরিচালনা করেছিলেন ‘অরুণ বরুণ কিরণমালা’।

কাছাকাছি সময়ে ‘গাজী কালু চম্পাবতী’ নিয়ে সিনেমা করেছিলেন মহিউদ্দিন। এগুলো বাংলা লোকগল্প। সময়ের সঙ্গে দেখা গেল, আরব্য রজনীর কাহিনীতে গুরুত্ব দিচ্ছেন নির্মাতারা। সে ধারাবাহিকতায় নির্মাণ হয় আজিজুর রহমানের ‘আলীবাবা ৪০ চোর’, শহীদুল আমিনের ‘শাহজাদী গুলবাহার’। শফি বিক্রমপুরীর প্রযোজনায় এসেছিল ‘আলাদীন আলীবাবা সিন্দাবাদ’। ১৯৮৭ সালে চাষী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘বেহুলা লখিন্দর’। কাছাকাছি সময়ে ‘ঝিনুকমালা’, ‘সতী কমলা’, ‘রসের বাইদানী’. ‘শঙ্খমালা’ ইত্যাদি নামের সিনেমাও মুক্তি পেয়েছিল। আশির দশকের পুরোটাই ছিল লোকগল্প ও লোকজ গল্পের সিনেমার সুসময়।

কেন এত সিনেমা নির্মাণ হলো? এর উত্তরে নানা রকম বিষয়ই আসবে। প্রথমত, সিনেমার ভোক্তা বা নির্মাতারা যে ধারার সিনেমা নির্মাণ করে ভালো আয় করতে পারেন, তারা সেটাই করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময় দেশের রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক অবস্থায় সফিস্টিকেটেড সিনেমার বাজার ছিল না। সিনেমার ভোক্তারা তাই লোকগল্প, নাচগান ইত্যাদিই পছন্দ করত। সেই সঙ্গে এ ধারার সিনেমায় সাফল্য আসার পর নির্মাতারাও ফর্মুলা সিনেমার পথেই হেঁটেছেন।

ভারতে ২০১৮ সালে মুক্তি পায় ‘কেজিএফ: চ্যাপ্টার ওয়ান’। কন্নড় ভাষার সিনেমাটি ধুন্ধুমার ব্যবসা করে। এ ধারায় পরবর্তী সময়ে আরো সিনেমা নির্মাণ হয়। কেজিএফের নির্মাতা প্রশান্ত নীল এরপর একই ফর্মুলায় নির্মাণ করেছিলেন ‘সালার’। কিন্তু ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া এ সিনেমা কেজিএফের মতো ব্যবসা করেনি। এর প্রথম কারণ পাঁচ বছরে দর্শকের রুচি বদলে গিয়েছিল। দ্বিতীয় কারণ কেজিএফের রকির গল্প ও সংলাপের সঙ্গে দর্শক নিজেকে যতটা যুক্ত করতে পেরেছিল, সালারের সঙ্গে ততটা পারেনি।

বাংলাদেশেও একই ঘটনা ঘটেছিল। প্রথমত, আশির দশকের পর দর্শকের রুচি বদলে গিয়েছিল। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী আবার সিনেমার ভোক্তা হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার আগে এ শ্রেণী সিনেমা দেখত না কিংবা গুলিস্তানসহ ঢাকার দুয়েকটি হলে বিদেশী সিনেমা দেখত। তাদের দুই পুরুষ পরের প্রজন্মটি নব্বইয়ের দশকে বাংলা সিনেমা দেখতে চাইত বিদেশী মডেলে। তার পছন্দ নাগরিক গল্প।

সে সময় বাংলা সিনেমায় আবির্ভাব নতুন কয়েকজন পরিচালক ও নায়ক-নায়িকার। নির্মাতাদের মধ্যে শিবলি সাদিক, সোহানুর রহমান সোহান, ছটকু আহমেদ, মতিন রহমান, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, কাজী হায়াত অন্যতম। এরা প্রায় সবাই আশির দশক থেকেই সক্রিয় হলেও নব্বইয়ে নতুন ধারার সিনেমা নির্মাণ করেছিলেন। ক্যামেরার সামনে এসেছিলেন সালমান শাহ, মৌসুমী, ওমর সানি, শাবনূর প্রমুখ। ইলিয়াস কাঞ্চন, আলমগীর, শাবানা, ববিতারাও তাদের সিনেমার ধারা বদলে ফেলেছিলেন। এ সময় দর্শকের পছন্দের তালিকায় ছিল প্রেম, নাগরিক সংকট, আত্মপরিচয়ের গল্প নিয়ে নির্মিত সিনেমা। এসব সিনেমায় বলিউডের প্রভাব থাকলেও নাগরিক জীবনের গল্প হওয়ায় নতুন সময়ের দর্শক সাদরে গ্রহণ করেছিলেন সিনেমাগুলো। এ সময়ও লোকগল্পের ওপর ভিত্তি করে চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে, তবে তা ছিল পূর্ববর্তী সিনেমাগুলোর সরাসরি রিমেক বা ভাবসন্তান।

সত্তরের দশকে নির্মিত লোকগল্পভিত্তিক সিনেমাগুলোর বড় অংশ ছিল বাংলার লোকগল্পকে কেন্দ্র করে। এরপর আরব্য রজনীর দিকে ঝুঁকে যান নির্মাতারা। সে গল্পগুলো উপভোগ্য হলেও একটা সময় দর্শক আর নিজেকে যুক্ত করতে পারেননি। এদিকে পরিবর্তিত সময়েও নির্মাতারা পুরনো ফর্মুলায়ই লোকগল্পের সিনেমা নির্মাণ করেছেন। আশির পরে তারা আর নতুন গল্পের সন্ধানও করেননি। এর মধ্যেও তোজাম্মেল হক বকুল, জিল্লুর রহমান, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, জীবন রহমান, শাহজাহান আকন্দ এমনকি মতিন রহমানও লোকগল্প নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করেছেন। তোজাম্মেল হক বকুলের সিনেমার সংখ্যা এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, অনেকটা ইবনে মিজানের মতো। তবে সাফল্যে ইবনে মিজানের ধারেকাছেও না।

নব্বইয়ের দশকের কথিত লোকগল্পের সিনেমাগুলোয় সত্যিকার লোকগল্প খুব একটা ছিল না। সেই সঙ্গে এ কালপর্বে ‘সাপের সিনেমা’ নির্মাণে পরিচালকদের আগ্রহ দেখা গেছে। নাগ-নাগিনীর কাহিনী নিয়ে অসংখ্য সিনেমা নির্মাণ হয়েছে। প্রথম দিকে জনপ্রিয়তা পেলেও একটা সময় দর্শক বিমুখ হয়েছে কেবল। দেলোয়ার জাহান ঝন্টু ২০০০ সালে নির্মাণ করেন ‘বিষে ভরা নাগিন’। সিনেমাটি নিয়ে আজও ট্রল হয়।

কিন্তু লোকগল্পের আবেদন ফুরায়নি। হলিউড, বলিউডসহ ভারতের অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিতে এ আধুনিক সময়েও নিজস্ব লোকগল্প নিয়ে অসাধারণ সব চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। বাংলাদেশেও সম্প্রতি কিছু কনটেন্ট তৈরি হয়েছে। কিন্তু নির্মাণটা হতে হবে সময়ানুগ, খুঁজতে হবে নতুন কিছু। লোকগল্পভিত্তিক সিনেমার প্রাসঙ্গিকতা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলাপ থাকবে পরবর্তী তথা শেষ পর্বে।