- মাধুকর প্রতিনিধি
- এই মাত্র
আগের ১৯ প্রকল্প নতুন সরকারের টেবিলে
অনলাইন ডেস্ক ►
এখন নতুন দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন তারেক রহমানের সরকারের প্রথম একনেক সভার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে আগের সরকারের সময় প্রণীত ও প্রস্তাবিত ১৯টি উন্নয়ন প্রকল্প। সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ একনেকে অনুমোদন দেওয়ার জন্য বিদায়ের আগে এ ব্যাপারে সুপারিশ করে গেছেন। ১৯টি প্রকল্পের মধ্যে ১০টি নতুন, ছয়টি সংশোধিত ও তিনটি মেয়াদ বৃদ্ধির প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পগুলোর মধ্যে ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণকেন্দ্রিক প্রকল্পই বেশি।
মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সভাপতি করে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) পুনর্গঠন করা হয়েছে। বিকল্প সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীসহ মোট ছয়জন মন্ত্রীকে সদস্য করে গঠিত এই কমিটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পর্যালোচনা, অনুমোদন ও বাস্তবায়ন তদারকির পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও মূল্যায়ন করবে। বেসরকারি বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রস্তাব বিবেচনা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত দিকনির্দেশনাও দেবে এই কমিটি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঈদের আগেই একটি একনেক হতে পারে। যেখানে এই প্রকল্পগুলোই প্রাধান্য পেতে পারে। কারণ অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা এখনো এখানে বেশি সময় দিতে পারছেন না। তিনি যেহেতু এখনো পরিকল্পনা কমিশন বুঝে উঠতে পারেননি। তাই পরিকল্পনা কমিশন থেকে যেগুলো সুপারিশ করা হচ্ছে, সেগুলোই অনুমোদনের সম্ভাবনা বেশি। রবিবার নতুন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রথম পরিকল্পনা কমিশনে আসেন এবং কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিত হন। এসব বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আগে পরিকল্পনা কমিশন সম্পর্কে জেনে তারপর জানাবেন বলেন।
একনেক সভায় উপস্থাপনের জন্য অপেক্ষমাণ প্রকল্পগুলোর একটি বড় অংশ নতুন অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবিত। এর মধ্যে রয়েছে রাজশাহী ও নাটোর জেলার বারনই নদী পুনর্খনন, দূষণমুক্ত ও দখলমুক্তকরণ প্রকল্প, যার প্রাক্কলিত ব্যয় ৪৬ কোটি টাকা। এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। জেলা শহরের বিদ্যমান মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রকে ৩০ শয্যায় উন্নীত বা পুনর্নির্মাণের (প্রথম ধাপ) প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে।
এ ছাড়া সাভার সেনানিবাসে সৈনিকদের জন্য ব্যারাক নির্মাণে ৩৮৫ কোটি টাকা, বরিশাল সেচ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনে ২৮২ কোটি টাকা এবং অংশীদারিমূলক পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি চতুর্থ পর্যায়ে ৫৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে বিমসটেক সচিবালয় ভবন নির্মাণে ১২২ কোটি টাকা, বাংলাদেশ সচিবালয়ে ২১ তলা অফিস ভবন নির্মাণে ৬৪৯ কোটি টাকা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য নিবাস নির্মাণে ৩০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব ও তালিকায় রয়েছে।
অন্যদিকে সংশোধিত প্রকল্পগুলোর ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রংপুর নভোথিয়েটার স্থাপন প্রকল্প (দ্বিতীয় সংশোধিত) এখন ৪৪৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ১০টি আইটি প্রশিক্ষণ ও ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন প্রকল্প দ্বিতীয় সংশোধনে বেড়ে হয়েছে ৫৩৩ কোটি টাকা, যেখানে মূল ব্যয় ছিল ২৬৫ কোটি টাকা। টেকনোলজি এমপাওয়ারমেন্ট সেন্টার অন হুইলস (টেকার) দ্বিতীয় পর্যায়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৭৫ কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় বৃদ্ধিও চোখে পড়ার মতো। বাপবিবোর বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ক্ষমতাবর্ধন প্রকল্প প্রথম সংশোধনে সাত হাজার ৪২৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। একইভাবে অভিযোজন ও দুর্বলতা হ্রাসে অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ প্রকল্প (রিভার) প্রথম সংশোধনে দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ২৮ কোটি টাকা। মধুখালী-কামারখালী হয়ে মাগুরা পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পও প্রথম সংশোধনে বেড়ে এক হাজার ২৬২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স, পিপিআর রোগ নির্মূল ও খুরারোগ নিয়ন্ত্রণ, হাই-টেক সিটি-২-এর সহায়ক অবকাঠামো, গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতাল এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়ও একাধিক সংশোধনের মাধ্যমে বেড়েছে।
সব মিলিয়ে নতুন ও সংশোধিত প্রকল্পগুলোর মোট আর্থিক দায় কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক চাপে থাকা সময়ে এত বড় অঙ্কের ও অবকাঠামো প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হবে কি না, নাকি ব্যয়সংকোচন ও অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাসের পথে হাঁটবে নতুন সরকার, সে দিকেই এখন নজর সবার। প্রথম একনেক সভাই ইঙ্গিত দেবে, উন্নয়ন ব্যয়ের গতি আগের ধারাতেই চলবে, নাকি আসবে নতুন কৌশল ও কড়াকড়ি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রকল্পগুলো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করেই একনেকে তোলা ভালো হবে। এমনিতেই সরকারের ওপর অনেক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের বোঝা চেপে রয়েছে। এখন সরকারের উচিত হবে প্রকল্পের প্রয়োজনীয় বিবেচনায় নিয়ে অনুমোদন দেওয়া।
জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুমোদিত এবং ১০ থেকে ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে ৮৬টি উন্নয়ন প্রকল্প। এসব প্রকল্পের ঘানিও টানতে হবে নির্বাচিত নতুন সরকারকে। পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব প্রকল্পে বিপুল অর্থ আটকে আছে। ফলে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। মনে করা হচ্ছে, নতুন সরকার চাইলেও সহজে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিতে পারবে না।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন মেয়াদে অনুমোদিত এই ৮৬টি প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছিল চার লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যয় করা হয়েছে তিন লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। তা মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৭.৯৪ শতাংশ। অথচ প্রকল্পগুলো এখনো শেষ হয়নি। বাকি কাজ শেষ করতে নতুন সরকারের জন্য প্রয়োজন হবে আরো এক লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) এই প্রকল্পগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৮ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা। যদি বর্তমান বরাদ্দের ধারা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে এসব প্রকল্প শেষ করতে পাঁচ-ছয় বছর লাগবে।