• মাধুকর প্রতিনিধি
  • তারিখঃ ৫-১২-২০২২, সময়ঃ দুপুর ০২:১৬

আমাদেরও একজন ফুটবলের জাদুকর ছিলেন



কঙ্কন সরকার ►

ফুটবল জাদুকরের নাম উঠলেই পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি, নেইমার, রোনালদিনহো কিংবা রোনালদোদের নাম চলে আসে। কিন্তু আমাদেরও যে একজন ফুটবল জাদুকর ছিলেন তার নাম কি জানি! তিনি হচ্ছেন 'জাদুকর সামাদ'। এই উপমহাদেশের ফুটবল ইতিহাসের কিংবদন্তি। জন্ম ভারতের বিহারের পুর্ণিয়ায়। (কোথাও কোথাও পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের ভুরী গ্রামের কথাও বলা হয়!) সালটা ১৮৯৫ সালের ৬ ডিসেম্বর। 'জাদুকর সামাদ’ নামে পরিচিত হলেও তাঁর পুরো নাম সৈয়দ আবদুস সামাদ। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ হলে জাদুকর সামাদ চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম বৃহৎ রেলওয়ে শহর পার্বতীপুরে। এরপর পুরো জীবনটাই কাটিয়েছেন এখানেই।

ছোটবেলা থেকেই তাঁর ফুটবলের প্রতি এক আকর্ষণ জন্মেছিল। আর এই আকর্ষণের ভিতর দিয়ে ফুটবল প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটতে শুরু করে তাঁর। মনোযোগ দিতে না পারায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে পড়াশোনায় ইতি টানেন তিনি। তবে ফুটবল খেলাতে পুরোপুরিই মনোনিবেশ ঘটে তাঁর। মাঠের সঙ্গেই গড়ে তোলেন সখ্য-ঘরবসতি—সবকিছুই। তাইতো ফুটবলে শিল্প শব্দটার পরিচিতি যেন জাদুকর সামাদের হাত ধরেই। ইতিহাস বলে তাঁর গতি ছিল চিতার সমতুল্য। ড্রিবলিং ছিল মনোমুগ্ধকর। পূর্ণিয়ার জুনিয়র একাদশে খেলা শুরু করে প্রথমেই মাত করে দেন সবাইকে। খুব অল্প বয়সেই নজর কাড়েন সবার। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই তিনি ফুটবল খেলতে পাড়ি জমান কলকাতায়। এরপরের গল্পটা কেবল জাদুকর সামাদের এগিয়ে চলারই।

জাদুকর সামাদ ১৯১২ সালে যোগ দেন কলিকাতা মেইন টাউন ক্লাবে। ১৯১৬ সালে তিনি মাঠে নামেন শক্তিশালী ইংলিশ ক্লাব সামারসেটের হয়ে। তাঁর খেলায় তিনি মুগ্ধ করেন জাত্যাভিমানী ব্রিটিশদেরও। ১৯২১ থেকে ১৯৩০ পর্যন্ত তিনি খেলেছেন বিখ্যাত ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবের হয়ে। ১৯২৭ সালে তাঁর দারুণ এক গোলেই ইংল্যান্ডের ম্যাশউড ফরেস্ট দলের বিপক্ষে জয় পেয়েছিল ইস্ট বেঙ্গল। ১৯৩৩ সালে মোহামেডান এ যোগদান করেন। সে সময় মোহামেডান পর পর পাঁচবার আইএফএ শিল্ড ও লিগ জয় করে। উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে অপূর্ব ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শন করে ফুটবল জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন তিনি। তবে তাঁর ছিল মাত্র ২৩ বছরের খেলোয়াড়ী জীবন। ছিলেন একজন রেলওয়ের স্টাফ।

জানা যায়, রংপুরের তাজহাটের রাজা গোপাল রায় (তিনি ছিলেন প্রখ্যাত ফুটবলারও) ১৯১৫ সালে তাজহাট টিম গঠন করেন, যার অন্যতম খেলোয়াড় ছিলেন সামাদ। যাহোক ১৯২৪ সালে জাদুকর সামাদ ভারতের জাতীয় ফুটবল দলে নির্বাচিত হন এবং ১৯২৬ সালে দলটির অধিনায়ক হন। তিনি সে সময় ভারতের হয়ে বার্মা (মিয়ানমার), সিলোন (শ্রীলঙ্কা), সুমাত্রা-জাভা-বোর্নিও (ইন্দোনেশিয়া), মালয় (মালয়েশিয়া), সিঙ্গাপুর, হংকং, চীন ও ইংল্যান্ড সফর করেন। চীনের বিপক্ষে একটি ম্যাচে বেশ সময় ভারত ৩-০ গোলে পিছিয়ে থাকার পরেও শেষে তাঁর দেওয়া চারটি গোলে ৪-৩ গোলে অবিস্মরণীয় এক জয় পেয়েছিল।

তাঁর খেলা দেখে ওই সময় স্কটিশ এক ফুটবলবোদ্ধার মন্তব্য ছিল, 'সামাদ ইউরোপে জন্ম গ্রহণ করলে সে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে স্বীকৃতি পেত।' ১৯৩২-এ সামাদ ভারতীয় ফুটবল সমিতির (আইএফএ) পক্ষ থেকে খেলতে গিয়েছিলেন শ্রীলঙ্কায়। পরের বছর বিখ্যাত মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে যোগ দেন। অসাধারণ ক্রীড়ানৈপুণ্য প্রদর্শন করায় সে বছর আইএফএ তাকে ‘হিরো অব দ্য গেমস’ উপাধিতে ভূষিত করে।

১৯৩৩ সালে সামাদের নেতৃত্বে সর্বভারতীয় দল গ্রেট বৃটেনকে ৪-১ গোলে এবং শক্তিশালী ইউরোপীয় টিমকে ২-১ গোলে পরাজিত করেছিল। যা ছিল অবিস্মরণীয় জয়! ভারতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে জীবনের শেষ খেলা খেলেছিলেন ইংল্যান্ডের সার্ভিসেস একাদশের বিরুদ্ধে।

জানা যায়, ইবিআর নামে যে রেলওয়ে ফুটবল টিম ছিল জাদুকর সামাদ তাতে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। এখন শুনি তাঁকে নিয়ে প্রচারিত কথাগুলো—যখন নাকি ফুটবল সিজন ব্রেক চলতো সে সময় কলিকাতার জমিদাররা তাঁকে ভাড়া করে নিয়ে যেত খেপ খেলতে। আর সেখানে করতেন মজা। অর্থাৎ ম্যাচ শুরুর আগে তিনি তাদের জিজ্ঞেস করতেন 'কত গোল দিবো?'  জমিদাররা ৫-৬ গোলের কথা বলতো। পুরো ম্যাচে সামাদ বল নিয়ে নেচে বেড়াতেন, কেউ তার থেকে বল নিতে পারতো না, কিন্তু তিনি গোল দিতেন না। ৭০-৭৫ মিনিটের সময় উদ্বিগ্ন জমিদার তাকে গোল দেয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি তাদের শান্ত হতে বলতেন, এরপর ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে ৫-৬ গোল দিয়ে চুক্তির টাকা নিয়ে যেতেন।খেলার মাঠে প্রতিনিয়ত অবিশ্বাস্য ঘটনার জন্ম দিতেন জাদুকর সামাদ।

তেমনি একটি ঘটনা ঘটেছিল একবার ইন্দোনেশিয়ায়। সর্বভারতীয় ফুটবল দল গিয়েছিল ইন্দোনেশিয়ার জাভায়। খেলা চলাকালে ইন্দোনেশিয়ার বেশ ক’জন খেলোয়াড়কে কাটিয়ে গোলপোস্ট লক্ষ্য করে তীব্র শট করলেন সামাদ। বল গোলপোস্টের ক্রসবারে লেগে ফিরে এলো মাঠে। বিস্মিত হলেন তিনি। গোল হলো না কেন! কিছুক্ষণ পর আবারো তাঁর তীব্র শটের বল ইন্দোনেশিয়ার গোলপোস্টের ক্রসবারে লেগে ফিরে এলো।

এবার তিনি রেফারিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন, 'গোলপোস্টের উচ্চতা কম আছে। তা না হলে, আমার দুটো শটেই গোল হতো'! ফিতে দিয়ে মেপে দেখা গেল সত্যিই গোলপোস্টের উচ্চতা স্ট্যান্ডার্ড মাপের চেয়ে চার ইঞ্চি কম রয়েছে! আরেকবার অন্য এক খেলায় মাঠের মধ্যস্থল থেকে বল নিয়ে সব খেলোয়াড়কে বোকা বানিয়ে বল ড্রিবলিং করে নিক্ষেপ করলেন গোলে, বল গোলে প্রবেশ না করে গোলপোস্টের কয়েক ইঞ্চি উপর দিয়ে বাইরে চলে গেলে রেফারি বাঁশি বাজিয়ে বলকে আউট ঘোষণা করলে সাথে সাথে জাদুকর সামাদ তা গোল হয়েছে বলে চ্যালেঞ্জ করে বসলেন। বললেন, 'আমার শটে নিশ্চিত গোল হয়েছে। গোলপোস্ট উচ্চতায় ছোট'। মেপে দেখা গেল সত্যিই তাই।

একবার এক খেলার আগ মুহূর্তে মাঠের চারদিকে পায়চারী করে এসে সামাদ ক্রীড়া কমিটির কাছে অভিযোগ করলেন, এ মাঠ আন্তর্জাতিক মাপ হিসেবে ছোট বিধায় এ মাঠে আমাদের টিম খেলতে পারে না। পরে মাঠ মাপার পর তার অভিযোগ সত্য বলে প্রমাণিত হয়।

তার সম্পর্কে আরো অনেক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। যেমন, তিনি নাকি খেলতে নেমে মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে গোঁফে তা দিতেন, আর বাদাম খেতেন। ও হ্যাঁ, তাঁর ছিল ইয়া গোঁফ। আর গোঁফে তা দেওয়াটাও ছিল তাঁর একটা স্বভাব। যাহোক, দলের অবস্থা যখন খারাপ হয়ে যেত, অথবা খেলার সময় যখন প্রায় শেষ সময়, তখন সঙ্গী খেলোয়াড় আর দর্শকদের চিৎকারে মাঠে নেমে ২/৩ টা গোল করে আবার ফিরে যেতেন আগের কাজে। গোল করা যেন তার কাছে ছিল ইচ্ছের বিষয়! জীবনে বহু ম্যাচে খেলা শুরুর আগেই নাকি বলে দিয়েছেন কয়টা গোল করবেন, এবং দিনশেষে সেটাই করে ফেলেছেন!

বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকের কথা, একদিন বিকেলে কলকাতার ইডেন গার্ডেন-এর বিপরীত দিকের ফুটপাত ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন প্রায় ছয় ফুট লম্বা একজন লোক। হঠাৎ তাঁর পাশে গাড়ি থামিয়ে নেমে এলেন স্বয়ং তৎকালীন বাংলার গভর্ণর এবং তাঁর কন্যা। গভর্ণর সোজা এগিয়ে গিয়ে আঁকড়ে ধরলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় গভর্ণরের সঙ্গী-সাথীদের সবাই হতভম্ভ! গভর্ণর লম্বা লোকটির হাত ধরে কুশল বিনিময় করলেন । তারপর, নিজ কন্যাকে ডেকে বললেন, 'এসো, ফুটবলের জাদুকরের সঙ্গে পরিচিত হও (Meet the wizard of football)।'

ইংল্যান্ডের কৃতি ফুটবলার এলেক হোসি একবার বলেছিলেন, 'বিশ্বমানের যেকোনো ফুটবল দলে খেলবার যোগ্যতা সামাদের রয়েছে।' জাদুকর সামাদের অসাধারণ ক্রীড়ানৈপুণ্য দেখে ইংল্যান্ডের তৎকালীন সেরা লেফট্ আউট কম্পটন চমকে উঠেছিলেন। বলেছিলেন, ‘ধারণা ছিল না এমন খেলোয়াড় এদেশে দেখতে পাবো!’ সৈয়দ আবদুস সামাদের ২৩ বছর খেলোয়াড়ী জীবনে এমন সব বিস্ময়কর ঘটনা তাঁর নামের সামনে 'জাদুকর' শব্দটি বসাতে বাধ্য করেছে।

অভিমান আর জেদও ছিল তাঁর। একবার আফ্রিকায় এক সফরের সময় ষড়যন্ত্র করে তাকে অধিনায়ক না করায়, জাদুকর সামাদ অভিমানে দল থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। সামাদবিহীন সর্বভারতীয় দলটি সেবার তেমন কোনো সাফল্যই দেখাতে পারেনি।

এই ফুটবল জাদুকর ১৯৩৬ সালে খেলার সময় গুরুতর আহত হবার পর তিনি আর তেমন করে খেলতে পারেননি কোনোদিনই। '৪৭ এর পরে যুক্ত হন সংগঠক হিসেবে। অর্থাৎ ১৯৫৭ সালে তিনি পাকিস্তান জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বেতনভুক ফুটবল কোচ হিসেবে চাকরি শুরু করেন। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে সম্মানিত করে রাষ্ট্রপতি পদক দিয়ে। ফুটবলে অসাধারণ ক্রীড়া নৈপুণ্যে জাদুকর আখ্যা পেলেও শেষ জীবনে দারিদ্রের কষাঘাতে প্রায় বিনাচিকিৎসায় ১৯৬৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি এই ফুটবলের জাদুকর মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে একবার তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তো নিঃশেষ হয়ে গেছি। আমার প্রাপ্য মর্যাদা আমি পেলাম না। আমি ধুঁকে ধুঁকে মরে যাব সেটাই ভালো। কারো করুণা এবং অনুগ্রহের প্রত্যাশী আমি নই।'

পার্বতীপুর শহরের ইসলামপুর কবরস্থানে সমাহিত আছেন তিনি। সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিসৌধ। তাঁর স্মরণে একটি স্মারক ডাক টিকেট প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার। পার্বতীপুরে রেলওয়ে নির্মিত 'সামাদ মিলনায়তন' নামে একটি মিলনায়তন আছে।
কথিত আছে, ফুটবল জাদুকর সামাদের সোনার মূর্তি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ পাননি। কিন্তু তিনি ছিলেন বাঙালি ফুটবলারদের আইকন।
লেখক ও সংগঠক।