- মাধুকর প্রতিনিধি
- এই মাত্র
কুকুর-বিড়ালের খামার থেকে আয় বছরে ৩০-৩৫ লাখ টাকা
সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর ►
পশু-পাখির প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই কুকুর ও বিড়াল পালন শুরু করেছিলেন দিনাজপুরের তরুণ উদ্যোক্তা জাহিদ ইসলাম সোহাগ (৩৫)। শখ থেকে শুরু করা সেই উদ্যোগ এখন রূপ নিয়েছে বাণিজ্যিক খামারে। তাঁর খামারে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বিদেশি কুকুর ও বিড়াল। প্রতি বছর এসব কুকুর ও বিড়ালের বংশবিস্তার থেকে পাওয়া বাচ্চা বিক্রি করে আয় করছেন ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা।
শুধু কুকুর-বিড়াল নয়, বর্তমানে তাঁর খামারে ঘোড়া, গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি ও কবুতরও রয়েছে। ফলে বহুমাত্রিক এই খামারটি দিনাজপুরে ব্যতিক্রমী একটি খামার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পূর্বে গর্ভেশ্বরী নদীর তীরঘেঁষা ঘাবুরা বাজারসংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে সোহাগের এই খামার। খামারের পাশেই পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। স্ত্রী রিফাত জাহান রিমিও স্বামীর সঙ্গে খামারের কাজে যুক্ত রয়েছেন। বর্তমানে খামারে তিনজন কর্মী নিয়মিত কাজ করেন। তবে কুকুর ও বিড়ালের পরিচর্যা, খাবার দেওয়া এবং সার্বিক দেখভালে নিজেই সার্বক্ষণিক নজর রাখেন সোহাগ।
২০১২ সালে একটি জার্মান শেফার্ড কুকুর দিয়ে সোহাগের এই যাত্রা শুরু। তখন লেখাপড়ার পাশাপাশি স্টুডিও ব্যবসা করতেন তিনি। অনুষ্ঠানের ভিডিও ধারণ ও সম্পাদনার কাজে প্রায়ই রাত জেগে থাকতে হতো তাঁকে। এক রাতে স্টুডিওতে কাজ করার সময় ঘটে একটি ঘটনা, যা তাঁর জীবন বদলে দেয়। সোহাগের ভাষ্য, ওই সময় তাঁর স্টুডিওতে থাকা জার্মান শেফার্ডটি হঠাৎ একদল ডাকাতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ডাকাতেরা স্টুডিওতে ঢুকে কম্পিউটার ও টাকা-পয়সা নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। কুকুরটিকে নির্দেশ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি ডাকাতদের ওপর আক্রমণ করে এবং দুজনকে কামড় দেয়। ওই ঘটনার পর কুকুরটির প্রতি তাঁর ভালোবাসা আরও বেড়ে যায়।
পরে সেই জার্মান শেফার্ড বাচ্চা দিলে ভালো দামে সেগুলো বিক্রি হয়। তখনই কুকুর পালনকে বাণিজ্যিকভাবে নেওয়ার চিন্তা করেন সোহাগ। ধীরে ধীরে বিদেশি বিভিন্ন জাতের কুকুর সংগ্রহ ও আমদানি করে খামারে যুক্ত করতে থাকেন তিনি। বর্তমানে সোহাগের খামারে ৩৫ থেকে ৪০টি বিদেশি জাতের কুকুর রয়েছে। এর মধ্যে, জার্মান শেফার্ড, ব্ল্যাক শেফার্ড, কিং শেফার্ড,উলফ শেফার্ড, আমেরিকান লাসা, আমেরিকান এস্কেমো, জার্মান স্পিচ, ইন্ডিয়ান স্পিচ, লাসা অ্যাপসো ও পোমেরিয়ানসহ বিভিন্ন জাত রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে চার থেকে ১০টি বিদেশি পারসিয়ান জাতের বিড়াল।
খামারের প্রতিটি কুকুরের রয়েছে আলাদা আলাদা নাম। নাম ধরে ডাকলেই নির্ধারিত স্থান থেকে ছুটে আসে তারা। মালিকের নির্দেশ অনুযায়ী বিভিন্ন কাজও করে। অপরিচিত কেউ খামারে প্রবেশ করলে অনেক কুকুর চিৎকার করে সতর্ক করে দেয়। সোহাগ জানান, ছোট জাতের কুকুরগুলো শখের বশে অনেকেই বাড়িতে পালনের জন্য কিনে নিয়ে যান। আর জার্মান শেফার্ড, কিং শেফার্ডসহ বড় জাতের কুকুর প্রশাসনের ডগ স্কোয়াডেও ব্যবহারের জন্য বিক্রি করা হয়।
সোহাগের স্ত্রী রিফাত জাহান রিমি বলেন, বিয়ের প্রথম দিকে তিনি কুকুরকে ভয় পেতেন। স্বামী যখন বাড়িতে জার্মান শেফার্ড নিয়ে আসেন, তখন প্রথমে আতঙ্কিত ছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে কুকুরটির আচরণ ও আনুগত্য দেখে তাঁর ভয় কেটে যায়। রিমি বলেন, কুকুরটির বাচ্চা হওয়ার পর সেগুলো ভালো দামে বিক্রি হয়। এরপর স্বামীর সঙ্গে আলোচনা করে তিনিও কুকুর পালনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এখন স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে খামারটি পরিচালনা করছেন। কুকুর-বিড়ালের পাশাপাশি অন্যান্য প্রাণী যুক্ত করে খামারটি আরও বড় করার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁদের।
কুকুর-বিড়াল খামারের কর্মী মমিনুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি এখানে কাজ করছেন। প্রতিদিন কুকুর ও বিড়ালকে খাবার দেওয়া, তাদের থাকার জায়গা পরিষ্কার করা এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করতে হয়। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘদিন কুকুরের সঙ্গে কাজ করতে করতে তিনিও প্রাণীগুলোর প্রতি ভালোবাসা অনুভব করতে শুরু করেছেন। ভবিষ্যতে নিজেও কুকুর ও বিড়ালের খামার করার স্বপ্ন দেখেন তিনি।
সোহাগ জানান, কুকুরদের নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয়। তাদের খাবারের তালিকায় খিচুড়ি, মাংস, বিশেষ করে মুরগির মাংস ও মাছ থাকে। প্রতিটি কুকুরকে নিয়মিত টিকা দেওয়া হয় বলেও জানান তিনি। প্রতিবেশী হোসনিয়ারা বেগম বলেন, সোহাগ তাঁদের প্রতিবেশী এবং সন্তানের মতো। তাঁর খামারের বিদেশি কুকুর ও বিড়াল দেখতে মাঝেমধ্যে আত্মীয়-স্বজনও আসেন। সোহাগের সঙ্গে থাকলে কুকুরগুলো শান্ত থাকে এবং তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করে। তিনি বলেন, বাইরে থেকে কেউ একা গেলে কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে। কিন্তু সোহাগ সঙ্গে থাকলে তারা সহজেই শান্ত হয়ে যায়। বিষয়টি দেখতে ভালো লাগে।
সোহাগের দাবি, কুকুর ও বিড়ালের বাচ্চা বিক্রি করে প্রতিবছর ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা আয় হচ্ছে তাঁদের। খামারে একসময় ৭০ থেকে ৮০টির মতো কুকুরও ছিল। চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে কুকুর বিক্রি করেছেন তিনি। তিনি বলেন, দেশে বিদেশি জাতের কুকুর ও বিড়ালের চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা সংস্থা এবং শখের বশে অনেকে এসব প্রাণী কিনে থাকেন। ফলে পরিকল্পিতভাবে খামারটি আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
জাহিদ ইসলাম সোহাগ বলেন, ‘শখ থেকেই আমার এই যাত্রা শুরু। একটি জার্মান শেফার্ড আমাকে এই ব্যবসার পথ দেখিয়েছে। এখন আমার স্বপ্ন খামারটি আরও বড় করা। সরকারি সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পেলে এখানে আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, কুকুর পালনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিষয়গুলো নিয়েও শুরুতে তাঁর মধ্যে সংশয় ছিল। পরে বিভিন্ন আলেম-ওলামার সঙ্গে কথা বলে বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা নিয়েছেন। প্রাণীগুলোর পরিচর্যা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়েও তিনি নিয়মিত গুরুত্ব দেন।
দিনাজপুর জেলা ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ডা. আশিকা আকবর তৃষা বলেন, দিনাজপুর জেলায় সোহাগের খামারটি কুকুর ও বিড়ালের একটি বাণিজ্যিক খামার হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। প্রাণিসম্পদ হাসপালের পক্ষ থেকে খামারটিতে নিয়মিত পরিদর্শন করা হয় এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, কুকুর ও বিড়ালের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত টিকাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে সোহাগকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। খামারটি ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হোক এবং উদ্যোক্তা আর্থিকভাবে লাভবান হন—এটাই প্রাণিসম্পদ বিভাগের প্রত্যাশা।
দিনাজপুর পশুপাখি সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি রেজাউল করিম রঞ্জু বলেন, শখের একটি কুকুর দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, এক যুগের বেশি সময় পর তা এখন পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক উদ্যোগে। প্রাণীর প্রতি ভালোবাসাকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা সোহাগের এই খামার শুধু তাঁর পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতাই আনেনি, তৈরি করেছে অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগও। ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম বড় কুকুর-বিড়ালের বাণিজ্যিক খামার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।