- মাধুকর প্রতিনিধি
- এই মাত্র
দিনাজপুর প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে নিয়োগ জালিয়াতির অভিযোগ
দিনাজপুর প্রতিনিধি ►
দিনাজপুরের শহীদ কর্নেল কুদরত এলাহী পাবলিক স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মাসুমা বেগমের বিরুদ্ধে সভাপতির স্বাক্ষর জালিয়াতি, স্বজনপ্রীতি, নিয়োগে অনিয়ম ও জালিয়াতি, খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগে ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম এবং নিয়মিত শিক্ষকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়টি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পরিচালিত হওয়ায় এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু করেছে বিজিবি।
বিদ্যালয় সূত্র ও অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে এমপিওভুক্ত হওয়ার পর চারজন শিক্ষক এমপিও সুবিধা পান। পরে এনটিআরসিএর মাধ্যমে আরও সাতজন নিয়মিত শিক্ষক বিদ্যালয়ে যোগ দেন। বর্তমানে বিদ্যালয়ে ১১ জন নিয়মিত শিক্ষক কর্মরত থাকলেও প্রধান শিক্ষিকা আরও ছয়জন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। অথচ বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৫০ জন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নিয়মিত শিক্ষক অভিযোগ করেন, বর্তমান শিক্ষকসংখ্যার তুলনায় ছয়জন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের বাস্তব প্রয়োজন ছিল না। প্রধান শিক্ষিকা নিজের প্রভাব বলয় তৈরি এবং ঘনিষ্ঠজনদের সুবিধা দিতে এসব নিয়োগ দিয়েছেন বলে তাদের অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, খণ্ডকালীন শিক্ষক শওকত আলম সাখিদারকে সহকারী প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বগুড়ার দুপচাঁচিয়া থেকে এসে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেলেও তাকে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে যুক্ত করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন শিক্ষকরা। এতে বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ছয়জন খণ্ডকালীন শিক্ষককে প্রতি মাসে প্রায় ৬৮ হাজার টাকা সম্মানী দেওয়া হয়। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক টিউশন ফি বাবদ আদায় হয় প্রায় ৭০ হাজার টাকা। অভিযোগকারীদের দাবি, টিউশন ফি থেকে আদায় করা অর্থের বড় একটি অংশ খণ্ডকালীন শিক্ষকদের সম্মানী বাবদ ব্যয় হচ্ছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি প্রধান শিক্ষিকা নিয়ন্ত্রণ করছেন।
এ ছাড়া বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সরকারি উপবৃত্তির আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় আবেদন করা হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক বলেন, ‘উপবৃত্তির বিষয়ে আমাদের কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে আবেদনও করা হয়নি। ফলে আমরা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।
প্রধান শিক্ষিকার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও গুরুতর অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে বিএড ডিগ্রি ও ১০ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। তবে মাসুমা বেগমের এসব যোগ্যতা পূরণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রতিযোগী প্রার্থী হিসেবে একই প্রতিষ্ঠানের মৌলভি শিক্ষক জহুরুল ইসলাম এবং ক্যামব্রিজ কিল্ডার গার্ডেন স্কুলের শিক্ষক রহমান আল মাসুদ প্রক্সি শিক্ষক হিসেবে আবেদন করেছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই দুই প্রার্থীর যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন থাকলেও তাদের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। পরে তারা অকৃতকার্য হলে মাসুমা বেগমকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তৎকালীন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের প্রভাব ও যোগসাজশ ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৩ সালে রংপুর শিক্ষা বিভাগের উপপরিচালকের কার্যালয় থেকে প্রধান শিক্ষক মাসুমা বেগমের নিয়োগসংক্রান্ত ফাইল দুই দফায় ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। প্রধান শিক্ষিকার এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা না থাকা এবং তিনি প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক না হওয়ায় ফাইলটি বাতিল করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সেটি পুনরায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয় এবং পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষিকার এমপিও সুবিধা কার্যকর হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যালোচনার সময় প্রধান শিক্ষিকার নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি ও বিজিবি সেক্টর কমান্ডার কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তদন্তে প্রধান শিক্ষিকার নিয়োগ প্রক্রিয়া, গুরুত্বপূর্ণ নথিতে সভাপতির স্বাক্ষর জালিয়াতি, স্বজনপ্রীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম, খণ্ডকালীন শিক্ষকদের দায়িত্ব বণ্টনে বিধি লঙ্ঘন, নিয়মিত শিক্ষকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগের বিষয়ে কিছু প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক বলেন, প্রধান শিক্ষিকার একক সিদ্ধান্ত, স্বেচ্ছাচারিতা ও অসৌজন্যমূলক আচরণের কারণে বিদ্যালয়ের কর্মপরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গেও অনেক সময় অশোভন আচরণ করা হয়। এতে বিজিবি পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং শিক্ষার্থী সংখ্যাও দিন দিন কমছে।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে কয়েকজন সাংবাদিক বিদ্যালয়ে গেলে প্রধান ফটক থেকেই তাদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় । পরে বিদ্যালয়ে প্রবেশ না করেই এই প্রতিবেদক সহ অন্য সংবাদকর্মীরা ফিরে আসেন। দিনাজপুর সেক্টরের অতিরিক্ত পরিচালক (এডি) মেজর মাহফুজ মোবাইল ফোনে বলেন, ‘আপনারা যে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন, সেটি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্ত শেষ হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তদন্তের ফলাফলও জানানো হবে।
অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষিকা মাসুমা বেগম মোবাইল ফোনে বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিজিবি তদন্ত করছে। তদন্ত শেষে কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত নেবে, আমি তা মেনে নেব। তদন্ত চলমান থাকায় এ বিষয়ে আমি আর কোনো মন্তব্য করতে চাই না।