- মাধুকর প্রতিনিধি
- এই মাত্র
মানবিক সমাজ গড়তে হলে আমাদের পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় করতে হবে
নজরুল ইসলাম ►
আজকের সমাজে প্রায়ই একটি কথা শোনা যায় যখন বাবা-মা দিবস ছিল না, তখন বৃদ্ধাশ্রমও ছিল না। এই কথার মধ্যে সমাজের পরিবর্তন এবং পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ পায়। অতীতে আমাদের সমাজে বাবা-মাকে পরিবারের সবচেয়ে সম্মানিত সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধ ছিল সন্তানদের নৈতিক কর্তব্য।
যৌথ পরিবার ব্যবস্থার কারণে বয়স্ক বাবা- মা কখনো একা হয়ে পড়তেন না। পরিবারের সবাই মিলে তাঁদের যত্ন নিত, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শকে মূল্য দিত। বর্তমান সময়ে বিশ্বায়ন, নগরায়ন এবং ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে পারিবারিক কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যৌথ পরিবারের পরিবর্তে একক পরিবার বেড়েছে। কর্মজীবনের চাপ, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতার ফলে অনেক সময় সন্তানরা বাবা-মায়ের জন্য সময় দিতে পারেন না।
এর ফলেই অনেক প্রবীণ মানুষ নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হয়, যা আমাদের সমাজের জন্য একটি বেদনাদায়ক বাস্তবতা। অনেকে মনে করেন, বাবা-মা দিবস পালনের প্রয়োজনই হতো না যদি প্রতিদিন তাঁদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও ভালোবাসা প্রদর্শন করা যেত। প্রকৃতপক্ষে, একজন সন্তানের কাছে বছরের একটি নির্দিষ্ট দিন নয়, বরং প্রতিটি দিনই বাবা-মায়ের জন্য ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন হওয়া উচিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দিন ছবি বা শুভেচ্ছা প্রকাশ করার চেয়ে তাঁদের পাশে থাকা, খোঁজ নেওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং মানসিক সঙ্গ দেওয়াই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটিও সত্য যে, সব বৃদ্ধাশ্রমের পেছনে অবহেলা একমাত্র কারণ নয়। অনেক প্রবীণ ব্যক্তি উন্নত চিকিৎসা, নিরাপত্তা বা বিশেষ পরিচর্যার জন্য স্বেচ্ছায় বৃদ্ধ নিবাসে থাকেন। আবার অনেক পরিবার আন্তরিকভাবে চাইলেও কর্মস্থল বা স্বাস্থ্যগত সীমাবদ্ধতার কারণে সব সময় প্রয়োজনীয় সেবা দিতে পারে না।
তাই সব পরিস্থিতিকে একই দৃষ্টিতে বিচার করা উচিত নয়। আমাদের সংস্কৃতি ও ধর্ম উভয়ই বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও সেবাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। তাঁদের ত্যাগ ও ভালোবাসার প্রতিদান কখনো সম্পূর্ণভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সন্তান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো তাঁদের সম্মান করা, তাঁদের অনুভূতির মূল্য দেওয়া এবং জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তাঁদের পাশে থাকা।
পরিশেষে বলা যায়, সমাজ যতই আধুনিক হোক না কেন, বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ কখনো পুরোনো হয় না। বাবা-মা দিবস পালন অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে, যদি তা আমাদের প্রতিদিনের আচরণে প্রতিফলিত হয়। একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজ গড়তে হলে আমাদের পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় করতে হবে এবং প্রবীণদের প্রতি আন্তরিক যত্নশীল হতে হবে। কারণ যে সন্তান আজ বাবা-মায়ের মর্যাদা রক্ষা করে, ভবিষ্যতে সেও তার সন্তানদের কাছ থেকে একই ভালোবাসা ও সম্মান পাওয়ার আশা করতে পারে।