- মাধুকর প্রতিনিধি
- ৮ ঘন্টা আগে
৫০ বছর ধরে উল্যাবাজারে মাছ বিক্রি করছেন লাল্টু দা
ভবতোষ রায় মনা ►
ভোর হতে না হতেই উল্যাবাজারের ব্যস্ততা শুরু হয়। সাঘাটার উপজেলার ভরতখালী ইউনিয়নের এই বাজারের পরিচিত মুখগুলোর মধ্যে একজন মানুষ আছেন, যাকে ছাড়া বাজারের সকালটা যেন ঠিক জমে না। তিনি আর কেউ নন, সবার প্রিয় ‘লাল্টু দা’ পুরো নাম লাল্টু রাম দাস (৭২)। গত ৫০ বছর ধরে উল্যাবাজারে মাছ বিক্রি করছেন তিনি। শুধু মাছ বিক্রেতা নন, এলাকার ছোট-বড় সবার কাছে তিনি এক পরম বন্ধু ও আস্থার প্রতীক।
লাল্টু দাকে সবাই চেনে তার স্বচ্ছতার জন্য। বাজারে কোনো টাটকা মাছ এলে সেটি সবার আগে লাল্টু দার ঝুড়িতেই দেখা যায়। ক্রেতারা বলেন, ‘লাল্টু দার কাছে কোনোদিন বাসি মাছের ভয় নেই। সে নিজেই বলে দেয় মাছের অবস্থা কেমন। এই সততাই তাকে বছরের পর বছর সবার কাছে জনপ্রিয় করে রেখেছে।’ লাল্টু দার দোকানের বৈশিষ্ট্যই হলো এখানকার হাসিখুশি পরিবেশ। মাছ কাটার ফাঁকে ফাঁকে খদ্দেরদের সাথে রাজনীতি, খেলাধুলা কিংবা পাড়ার খবরাখবর-সবই চলে সমানতালে। বয়সের ভারে এখন কিছুটা ধীরগতি হলেও, মাছ কোটার হাত আজও আগের মতোই ঝকঝকে।
দীর্ঘদিন ধরে লাল্টু দার কাছ থেকে মাছ কেনেন ভরতখালী রেলওয়ে কলোনীর বিজয় চন্দ্র। তিনি জানালেন, ‘মাছ কিনতে তো আসিই, কিন্তু লাল্টু দার সাথে আড্ডা না দিলে দিনটাই যেন অসম্পূর্ণ লাগে।’ উল্ল্যাবাজারের বাসিন্দা মুহাম্মদ হাসান বলেন, কতো শত স্মৃতি লালটু দার থেকে দরদাম করে মাছ কিনার। উনি বিশেষ করে নদীর ছোট মাছই বেশি বিক্রি করতেন। বিশেষত বোরেল মাছ। এছাড়াও অন্যান্য মাছও তাঁর কাছে পাওয়া যেত।
আধুনিক সুপারশপ আর অনলাইন ডেলিভারির যুগেও লাল্টু দার মতো ছোট ব্যবসায়ীরা যে আজও টিকে আছেন, তা প্রমাণ করে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের গুরুত্ব। উল্যাবাজারের প্রতিটি অলিগলিতে আজো লাল্টু দার হাঁকডাক জানান দেয়-মানুষ আজও আস্থার টানেই বাজারে আসে। উল্যাবাজারের ব্যস্ত জীবনে লাল্টু দা যেন এক জীবন্ত ইতিহাস। এই প্রবীণ মানুষটি আজও হাসি মুখে মাছ মেপে যাচ্ছেন, আর তার সাথেই মেপে যাচ্ছেন দীর্ঘ কয়েক দশকের অর্জিত মানুষের ভালোবাসা।
লাল্টু রাম দাসের বাড়ি সাঘাটা উপজেলার দক্ষিণ উল্লা বরমতাইড় গ্রামে। স্ত্রী সাধনা রানী দাস, এক পুত্র ও চার কন্যা নিয়ে তার সংসার। চার কন্যার বিয়েসাদি হয়ে গেছে অনেক আগেই। ছেলে দয়াল চন্দ্র দাসও বাবার পেশায় মনোনিবেশ দিয়ে পিতা-পুত্র একসাথে মাছ বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছে। তবে খাল-বিল, নদী-নালায় আগের মতো মাছ পাওয়া তার দুচিন্তায় পড়েছেন। তারপর আবার এসব খাল-বিল, নদী-নালা সরকারিভাবে ইজারা দেওয়ায় মাছ ধরতে পারচ্ছেন না। আড়াত থেকে পাইকারি মাছ কিনে তা বাজারে বিক্রি করে খুব কষ্টে সংসার চালাচ্ছেন।
লাল্টু দা যখন উল্যাবাজারে মাছ বিক্রি শুরু করেছিলেন, তখন বাজার আজকের মতো ছিল না। বাজারের বিবর্তন আর শহরের বদল-সবই দেখেছেন তিনি। নিজের সম্পর্কে বিনয়ী (লাল্টু দা) লাল্টু রাম দাস বলেন, মাছ বিক্রি করা আমার পেশা হলেও, এই বাজারের মানুষগুলোই আমার পরিবার। যতদিন শরীর চলে, মানুষের সেবা আর এই আড্ডা দিয়ে যাবো।